অনলাইন ডেস্ক : ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হুমকির মধ্যেই যুদ্ধ এড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এমন বার্তার মাঝেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও জলসীমায় সামরিক তৎপরতা থেমে নেই। বরং অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির স্পষ্ট আলামত দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন–এর নেতৃত্বে একটি বিশাল নৌবহর ইরানের জলসীমার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানিয়েছে, তারা তাদের সামরিক ভাণ্ডারে এক হাজার নতুন ড্রোন যুক্ত করেছে। উভয় পক্ষের এই শক্তি প্রদর্শন সংকটকে আরও উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছে।
২০২৬ সালে এসে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সামরিক শক্তির বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষস্থানে থাকলেও ইরানও পিছিয়ে নেই। সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরান বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১৫ দেশের মধ্যে রয়েছে।
ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি তাদের বিপুল জনবল। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী মূলত দুটি সমান্তরাল কাঠামোয় বিভক্ত— প্রচলিত সেনাবাহিনী এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এই দুই বাহিনী মিলিয়ে ইরানের সক্রিয় সেনা সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার।
এ ছাড়া দেশটির রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ রিজার্ভ সেনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি, যারা প্রয়োজনে দ্রুত যুদ্ধের মাঠে নামতে সক্ষম।
ইরানের সামরিক কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক। তেহরান এটিকে তাদের ‘প্রতিরক্ষার প্রথম স্তর’ হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই জোটকে নাম দিয়েছে ‘অক্ষশক্তি’।
লেবাননের হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, ইরানের ওপর কোনো হামলাকে তারা নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে দেখবে। সংগঠনটি সতর্ক করেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ‘আগুনে পুড়ে যাবে’।
এ ছাড়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরাকে ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’-এর আওতাধীন কাতায়েব হিজবুল্লাহ ও আল-নুজাবা, সিরিয়ার বিভিন্ন মিলিশিয়া এবং ফাতেমিউন ব্রিগেড— এসবই ইরানের সরাসরি সমর্থিত প্রক্সি বাহিনী হিসেবে পরিচিত।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে ধরা হয়। দেশটির ভাণ্ডারে রয়েছে কয়েক হাজার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল। ইরান দাবি করছে, তাদের কাছে ফাত্তাহ-১ ও ফাত্তাহ-২ নামের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা শব্দের চেয়ে ১৩ থেকে ১৫ গুণ দ্রুতগতিতে চলতে পারে এবং রাডার এড়াতে সক্ষম।
এ ছাড়া খোরামশাহর, সেজ্জিল ও শাহাব-৩–এর মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যেগুলোর পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল বা দক্ষিণ ইউরোপের কিছু অংশে আঘাত হানতে সক্ষম।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন এখন অন্যতম প্রধান অস্ত্র, আর এই ক্ষেত্রে ইরান উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের তৈরি শাহেদ-১৩৬ কামিকাজে ড্রোন স্বল্প খরচে ব্যাপক ধ্বংস সাধনে সক্ষম বলে পরিচিত।
ইরানের তৈরি ড্রোন ইতোমধ্যেই রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও বাস্তব সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পারস্য উপসাগর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির নৌবাহিনীর কাছে কয়েকশ ছোট ও দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাবমেরিন। স্থল বাহিনীর দিক থেকেও ইরান কম শক্তিশালী নয়। তাদের কাছে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার ট্যাঙ্ক এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি আর্টিলারি গান।
সব সক্ষমতার পরও ইরানের কিছু বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশটির বেশিরভাগ যুদ্ধবিমান— যেমন এফ-১৪ ও মিগ-২৯— পুরনো প্রযুক্তির। যদিও রাশিয়া থেকে আধুনিক সু-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহের চেষ্টা চলছে, তবু আকাশ শক্তির ক্ষেত্রে তারা এখনও পশ্চিমা শক্তির তুলনায় পিছিয়ে।
আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ইরান মূলত নিজেদের তৈরি বাভার-৩৭৩ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেটিকে তারা রাশিয়ার এস-৩০০-এর সমতুল্য বলে দাবি করে। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি ইরানের হাতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র— হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই যায়। ইরান ইতোমধ্যেই এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
