অনলাইন ডেস্ক : জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে মার্কিন অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাড়ার ফলে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি বার্ষিক চার দশমিক তিন শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে তিন দশমিক আট শতাংশ ছিল।
এটি প্রত্যাশার চেয়েও ভালো এবং দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। মার্কিন সরকারের শাটডাউনের কারণে প্রতিবেদনটি প্রকাশে দেরি হলেও এতে এমন একটি অর্থনীতির চিত্র উঠে এসেছে, যা বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর মতো নানা চাপের মুখে পড়েছে।
তবে এসব কারণে আমদানি ও রপ্তানির মতো কিছু ক্ষেত্রে বড় ধরণের ওঠানামা দেখা গেলেও, সামগ্রিক অর্থনীতির ভেতরের গতি শক্তিশালীই ছিল এবং এটি অনেক পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক অব আমেরিকার সিনিয়র অর্থনীতিবিদ আদিত্য ভাভে বলেন, ‘২০২২ সালের শুরু থেকেই এই অর্থনীতি মূলত সব ধরনের হতাশাজনক পূর্বাভাসকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যাচ্ছে।’
বিবিসি-র ‘বিজনেস টুডে’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় আদিত্য অর্থনীতিকে ‘খুবই খুবই স্থিতিশীল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আগামীতেও এটি অব্যাহত না থাকার কোনো কারণ আমি দেখছি না।’ চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
যেখানে বেশিরভাগ বিশ্লেষক বার্ষিক হিসাবে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করেছিলেন, সেখানে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। এটি মূলত ভোক্তা ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে বৃদ্ধি পেয়েছে যা বার্ষিক তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে বেড়েছে (পূর্ববর্তী প্রান্তিকে যা ছিল দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ)। কর্মসংস্থানের বাজার ধীরগতি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও, পরিবারগুলো স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেশি ব্যয় করার ফলে এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি হিসাবের ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য হওয়া আমদানিও কমতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী পণ্যের ওপর যে কর আরোপের ঘোষণা দেন, তার প্রভাবেই আমদানিতে এই ধারাবাহিক পতন দেখা গেছে। এদিকে, আগের প্রান্তিকে ব্যাপকভাবে হ্রাস হওয়া রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সরকারি ব্যয়ও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়িক বিনিয়োগের (মেধা সম্পদসহ) ধীরগতি এবং উচ্চ সুদের হারের চাপে ধুঁকতে থাকা আবাসন খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে এই অর্জনগুলো সহায়তা করেছে। উল্লেখ্য যে, এই উচ্চ সুদের হার বর্তমানে আবাসন কেনার সামর্থ্য কমিয়ে দিয়েছে এবং জোগানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল পিয়ার্স বলেন, ২০২৬ সালে প্রবেশের মুখে অর্থনীতি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সেই সময়ে কর ছাড় এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর সুফল অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করবে। তিনি বলেন, ‘ভিত্তিগত পরিমাপকগুলো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রসারের সংকেত দিচ্ছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই পরিসংখ্যানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তার আরোপিত শুল্কই এর জন্য দায়ী।
ভোক্তা আস্থার অবনতি এবং অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা জরিপের ফল সামনে আসার প্রেক্ষাপটে তিনি তখন আত্মপক্ষ সমর্থনে ছিলেন। তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, কিছু পরিবারের ওপর বাড়তে থাকা মূল্যচাপ সাম্প্রতিক প্রান্তিকে দেখা এই অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন করে তুলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর:এই তিন মাসে ফেডারেল রিজার্ভের পছন্দের মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপক সূচক, ‘পার্সোনাল কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার প্রাইস ইনডেক্স’, দুই দশমিক আট শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগের প্রান্তিকে যা ছিল দুই দশমিক এক শতাংশ। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো অবাধে খরচ চালিয়ে গেলেও, এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি করছে।
প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিক্সের সিনিয়র মার্কিন অর্থনীতিবিদ অলিভার অ্যালেন উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক কিছু জরিপ এবং ক্রেডিট কার্ডের তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে পরিবারগুলো এখন তাদের খরচ কমিয়ে আনছে। তিনি বলেন, ‘দুর্বল শ্রমবাজার, স্থবির প্রকৃত আয় এবং মহামারীকালীন অতিরিক্ত সঞ্চয় ফুরিয়ে আসাÑএই সবকিছুর প্রভাব অবশেষে সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর পড়তে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি।
