অনলাইন ডেস্ক : ২০২৪ সালের ১০ আগস্টের ভোর, গাজা সিটির তাবিন স্কুলে হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েল। ভয়াবহ ওই হামলার পর ইয়াসমিন মাহানি নামে এক মা ধোঁয়াচ্ছন্ন ধ্বংসাবশেষের ভেতর খুঁজছিলেন নিজের স্বামী ও সন্তানকে। ওই সময় স্বামীকে খুঁজে পান তিনি। তবে ভয়াবহ যন্ত্রণায় চিৎকার ও কাতরাচ্ছিলেন তিনি। স্বামীকে পেলেও ছেলে সাদের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাননি সেখানে। ইসরায়েলের হামলার পর সাদ যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছেন।
গতকাল সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা অ্যারাবিক একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ওঠে এসেছে ইসরায়েলের ভয়াবহ ও নিষিদ্ধ অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২ হাজার ৮৪২ ফিলিস্তিনি ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে গেছেন।
ইয়াসমিন মাহানি বলেছেন, “আমি মসজিদে যাই, সেখানে গিয়ে রক্ত ও মানুষের মাংস ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।” এরপর কয়েকদিন হাসপাতাল ও মর্গে ছেলের খোঁজ করেছেন তিনি। কিন্তু পাননি। ইয়াসমিন বলেন, “আমরা সাদের কোনো কিছু পাইনি। কবর দেওয়ার মতো মরদেহও। এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন বিষয়।”
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরায়েলের হামলায় গাজায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের ওপর বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নৃশংস অস্ত্র ব্যবহার করেছে ইসরায়েলি সেনারা।
আলজাজিরার তদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর ২ হাজার ৮৪২ ফিলিস্তিনি বাতাসে মিলিয়ে গেছেন। তাদের শরীরের রক্ত ও অল্প কিছু মাংস ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, এটি হয়েছে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে। যেগুলোকে অনেক সময় ভ্যাকুয়াম ও অ্যারোসেল বোমা হিসেবে ডাকা হয়। এসব বোমা ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উৎপন্ন করে। যা একটি মানুষকে সহজেই গলিয়ে দিতে পারে।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আলজাজিরাকে বলেছেন, তারা যে ২ হাজার ৮৪২ জন মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। সেটি কোনো অনুমান থেকে বলা নয়।
তিনি বলেন, “হামলা চালানো বাড়িতে আমরা প্রবেশ করে সেখানে থাকা বাসিন্দা কতজন ছিলেন আর কতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে সেটির হিসাব রাখতাম। যদি পরিবারের সদস্যরা বলতেন ঘরে পাঁচজন ছিলেন। আর আমরা তিনজনের মরদেহ পেতাম। তাহলে বাকিদের ‘বাতাসে মিলিয়ে’ যাওয়া হিসেবে ধরতাম।”
আলজাজিরার তদন্তে দেখা গেছে দখলদার ইসরায়েল অস্ত্রে রাসায়নিক ব্যবহার করায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একজন মানুষ ছাইয়ে পরিণত হয়েছেন।
রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারোভ বলেছেন, “থারমোবারিক বোমা শুধুমাত্র হত্যাই করে না। এগুলো (মানুষ বা অন্য যে কোনো কিছুকে) নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এই অস্ত্র জ্বালানির একটি মেঘ নিঃস্বরণ করে। যেটি শক্তিশালী আগুনের গোলা ও ভ্যাকুয়াম ইফেক্ট তৈরি করে।”
“পোড়ানোর সময় বৃদ্ধি করতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও টাইটানিয়ামের গুঁড়া রাসায়নিকের মিশ্রণে ব্যবহার করা হয়। এটি বিস্ফোরণের তাপমাত্রা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০০ ডিগ্রিতে তুলে দেয়।”
এই তাপমাত্রা উৎপন্ন করে ট্রিটোনাল নামে একটি বস্তু। এটি টিএনটি এবং অ্যালুমিনিয়াম গুঁড়ার একটি মিশ্রণ। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমকে-৮৪ বোমায় ব্যবহার করা হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ডাক্তার মুনির আল-বুর্শ মানবদেহে এমন তাপমাত্রার প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন।
তিনি বলেছেন, “মানুষের শরীরের ৮০ শতাংশ পানি। আর পানি ফোটার জন্য প্রয়োজন ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ। যখন একটি মানবদেহ ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ভেতর পড়ে, সঙ্গে ব্যাপক চাপ ও জারণ হয়, তখন মানুষের শরীরের ভেতরে থাকা পানি ফুটতে শুরু করে। এর ফলে শরীরের টিস্যু বাষ্পীভূত হয়ে ছাইয়ে পরিণত হয়।”
সূত্র: আলজাজিরা

