অনলাইন ডেস্ক : দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে উচ্চ জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা। ভূরাজনৈতিক এ অবস্থার মধ্যে এবার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি অবস্থানে ঘোরাফেরা করছে জাপানি মুদ্রা ইয়েন। এ অবস্থায় বাজারে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগকারীরা।
বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে বুধবার ডলারের দর সামান্য বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হারের সিদ্ধান্তের দিকে। একই সঙ্গে ব্যাংকের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা তৈরি করেছে।
পাশাপাশি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একাধিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের (যেমন- অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও মেটা) আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষাও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক রেখেছে।
এদিন মুদ্রাবাজারে ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ০.০৭ শতাংশ কমে ১.১৭০৫ ডলারে নেমেছে। আর ব্রিটিশ পাউন্ড ০.০৫ শতাংশ কমে ১.৩৫১৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের তুলনায় ইউরোর দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে গেছে, অন্যদিকে পাউন্ডের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাজারের মূল নজর এখন ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলছে এবং জেরোম পাওয়েল ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেন—সেই বিষয়গুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে কমনওয়েলথ ব্যাংক অফ অস্ট্রেলিয়ার মুদ্রা কৌশলবিদ ক্যারল কং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, পাওয়েল আগেই জানিয়েছেন, যদি তিনি মনে করেন যে ফেডের স্বাধীনতা হুমকির মুখে, তাহলে তিনি এ দায়িত্বে থাকবেন। আমার মতে, তার সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তিনি ফেডের স্বাধীনতাকে কীভাবে দেখছেন তার ওপর।
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে।
এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়ছে।
টানা অষ্টম দিনের মতো তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের পর টানা ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা। এই মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বাড়াচ্ছে।
বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় আর্থিক পরিষেবা গোষ্ঠী এমইউএফজির গ্লোবাল মার্কেট বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা অঞ্চলের বৈশ্বিক বাণিজ্যের (ইএমইএ) গবেষণা প্রধান ডেরেক হ্যালপেনি বলেছেন, অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠেছে। ফলে গ্রীষ্মকালজুড়ে অর্থনৈতিক প্রভাব আরো গুরুতর হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, এ প্রভাবে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপ ও এশিয়া। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরো এবং এশীয় মুদ্রাগুলোর ওপর আরো নিম্নমুখী চাপ তৈরি হবে।
ইয়েনের পতন ঠেকাতে বাজারে হস্তক্ষেপ
বিশ্ববাজারে ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েন ১৬০ এর কাছাকাছি অবস্থানে ঘোরাফেরা করছে। ফলে বাজারে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিনিয়োগকারীরা।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার নীতিনির্ধারণী বৈঠকের পর ব্যাংক অফ জাপান সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও মুদ্রাটির তেমন শক্তিশালী অবস্থান দেখা যায়নি।
বুধবার ডলারের বিপরীতে ইয়েন প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১৫৯.৬৩ এ অবস্থান রয়েছে। চলতি মাসে এটি ডলারের বিপরীতে প্রায় ০.৬ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। আর যুদ্ধ শুরুর পর মুদ্রটির মান কমেছে ২ শতাংশের অল্প বেশি। এর পেছনে আমদানিনির্ভর জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাবকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কাজুও উয়েদা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা না এলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার বাড়াতে প্রস্তুত রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও তা ধীরগতিতে হবে। ওভারসি চাইনিজ ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেডের (ওসিবিসি) কৌশলবিদ সিম মোহ সিয়ং বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েনের আরও বড় পতন সীমিত থাকতে পারে। কারণ এটি ইতোমধ্যেই হস্তক্ষেপের কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। তবে এর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ারও সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে ইয়েনের বিপক্ষে বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক অবস্থান এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে ডলারের বিপরীতে এই মুদ্রার বিনিময় হার ১৬১ ছাড়ালেও বাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল জাপান সরকার।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজেদের মুদ্রা মান শক্তিশালী করতে ডলারের বিপরীতে ১৬০ স্তরকে ধরে রাখতে সম্ভাব্য ‘ট্রিগার’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা সতর্ক রয়েছেন।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার মুদ্রা অস্ট্রেলিয়ান ডলার ০.২৬ শতাংশ কমে ০.৭১৬৪ ডলারে নেমেছে। দেশটির সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্য মূল্যচাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিলেও মূল সূচক প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনীতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ইউরো ও এশীয় মুদ্রাগুলোর ওপর আরো চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
