অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা নিরসন ও পারমাণবিক কর্মসূচির জটিল জট খুলতে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রভাবশালী জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা তথা জামাতা জ্যারেড কুশনারকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পাঠাচ্ছেন। চলতি সপ্তাহান্তেই তারা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বৈঠকে বসবেন।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে দুই শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ব রাজনীতি যখন খাদের কিনারায়, তখন পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকে শেষ আশার আলো হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই শান্তি আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উপস্থিত থাকার জোরালো সম্ভাবনা থাকলেও, বর্তমানে তিনি তার সফর পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।
হোয়াইট হাউসের মতে, ইরানের শক্তিশালী স্পিকার মোহাম্মদ-বাগের গালিবফ এই টেবিলে অংশ না নেওয়ায় ভ্যান্স আপাতত পিছিয়ে এসেছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা গালিবফকে ইরানি প্রতিনিধিদলের প্রধান এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে যদি ইতিবাচক কোনো অগ্রগতির আভাস পাওয়া যায়, তবে জেডি ভ্যান্স যেকোনো মুহূর্তে সেখানে যাওয়ার জন্য ‘স্ট্যান্ডবাই’ বা প্রস্তুত রয়েছেন। ইতোমধ্যে তার দফতরের বিশেষ প্রতিনিধিরা আলোচনার খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণের জন্য পাকিস্তানে অবস্থান করছেন।
এই আলোচনাটি এমন এক সংকটময় মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন হরমুজ প্রণালিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে, যার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তেহরানও এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। বিশ্ব তেলের বাজারের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়া এই প্রণালিতে বর্তমানে একধরনের ‘দ্বৈত অবরোধ’ চলছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতঃপূর্বে ইরানের পারমাণবিক উপকরণ জব্দ ও অপসারণের শর্তে একটি সম্ভাব্য চুক্তির কথা বললেও, ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের বিষয়ে এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। এর আগে ওমান ও পাকিস্তানের উদ্যোগে কয়েক দফা আলোচনা হলেও পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা না হওয়ায় তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।
জ্যারেড কুশনারের মতো ঝানু কূটনীতিককে এই মিশনে পাঠানোর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান চাইছে। গত কয়েক মাস ধরেই কুশনার ও উইটকফ গোপনে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের আলোচনার পর মস্কো ও মাস্কাট সফরের পরিকল্পনা করছেন, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইসলামাবাদের এই বৈঠকটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। যদি কুশনার-উইটকফ জুটি আরাঘচির সঙ্গে কোনো ন্যূনতম সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, তবে তা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানো এবং একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে সাহায্য করবে। রাশিয়ার মতো দেশগুলো এই সংলাপকে স্বাগত জানিয়ে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েল সতর্ক দৃষ্টি রাখছে ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের ওপর।
আপাতত গোটা বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের রেড জোনের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে শান্তি নাকি আরও দীর্ঘস্থায়ী এক সংঘাত। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে বরফ গলাতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: সিএনএন

