দেলওয়ার এলাহী : ১.
কাজীদার এই গানখানি কে না জানেন! ধারণা করি, আমাদের প্রায় অনেকেই এই গানখানি একাকী পথে যেতে যেতে গুনগুন করে কাধিকবার গেয়েছেনও। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবন ও জীবনচর্চার ভাবনার সঙ্গেও যেন গানখানি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
কেউ কেউ সারাজীবনই এই গানের বাণীর হতো শৈশবের অনেক কিছু স্মৃতির ভারে বহন করে চলেছেন আমৃত্যু। শাহনওয়াজ ভাই সেদিন গল্পে গল্পে বলছিলেন সেই গয়না নৌকার কথা – যার বিশাল বিপুল ছৈয়ের উপরে দুদিক থেকে ছড়িয়ে বুজাই করা থাকে মাটির কলসি, ডেকচি, শানকি ও থালাবাটি। নদীতে মৌসুমি পানি থাকলেও, সেই নৌকোর যাতায়াত যে নেই এখন আর! নেই গয়না নৌকার ঢুলের ডাকের শব্দ? আসলে এগুলো তো সময়ের সঙ্গে স্থানকালের অনুষঙ্গ। মূলত এই অনুষঙ্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সেই মায়াবী মুখের স্নেহের হাতছানি, কাদামাখা শরীরের ছোট্ট আমাকে যারা কোলে নিয়েছেন। সকল আবদার সহ্য করেছেন আনন্দের সাথে। নদী, গয়না নৌকা, মাঠের মাঝখান দিয়ে আলপথ, এগুলোকে নিয়েই তো আমার জন্ম হয়েছিল! থাক সে কথা, নতুবা প্রসঙ্গান্তর হয়ে আমি চলে যাবো সেই ইকরাম গ্রামে নানির কাছে! যেখানে আমার মায়ের জন্ম ছায়াসুনিবিড় স্তূপীকৃত খড়ের পাশের ঘরে!
শেখ শাহনওয়াজ পঁচাত্তর বছর বয়সের তরুণ। শুধু বাক্যবন্ধ দিয়ে আমি তাঁকে তরুণ বলছি না, তিনি সত্যিকার অর্থেই তরুণ : আধুনিক ভাবনায়, জীবনদর্শনের চর্চায়, শিল্পের রূপরস গ্রহণের উদগ্রীবতায়, বন্ধু-সঙ্গের জন্য ব্যাকুলতায়। এহেন শাহনওয়াজ ভাই সাংবাদিকতার প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতার সাথে আরো আরো স্মৃতিসুখের উপাদানে একটি গ্রন্থ রচনা করবেন, এ যে আমাদের জন্য পরম আনন্দের ও সুখের, এ কথা বলাই বাহুল্য।
২.
‘কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে’ গ্রন্থটি পাঠ করতে গিয়ে আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছে। কেননা, গ্রন্থটি পাঠ শুরু করে শেষ না করে আমার আর কোন স্বস্তি ছিল না! বর্তমানের জাতীয় প্রেস ক্লাবের একদা সেই লাল বাড়িটির কথা আমার মানসচক্ষে ভেসে ভেসে আসছিল। যে বাড়িটিতে বসবাস করতেন বিশ্বখ্যাত সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কে না জানে, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কথা উল্লেখ করলেই অবধারিতভাবে আরেকটি নাম চোখের সামনে ভেসে ওঠবেই : মেঘনাদ সাহা। বিশ্বাস করা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে এঁদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন স্বয়ং বিশ্ববিখ্যাত আইনষ্ঠাইন!

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর একদা বাসকৃত সেই লাল বাড়ির স্থলেই আজকের প্রেস ক্লাবের নতুন ভবন। শেখ শাহনওয়াজ যখন প্রেস ক্লাবের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, তখন তাঁর উর্ধতন ছিলেন বিখ্যাত গিয়াস কামাল চৌধুরী। ভয়েস অফ আমেরিকার তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ প্রতিনিধি গিয়াস কামাল চৌধুরীর নামটি শুনলেই তাঁর বড় কবি বেলাল চৌধুরীর মুখটিই আমার সামনে ভেসে ওঠতো। জগতে মানুষের মনস্তাত্তি¡ক চিন্তাধারা কত দিকে যে ছড়ানো ছিটানো থাকে, ভাবলে অবাক হই। কবি বেলাল চৌধুরীর ভাই হিসেবে গিয়াস কামাল চৌধুরীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে অনেকেরই একটু একটু অনুযোগ-অভিযোগ শুনতাম। আমিও কি বেলাল ভাইয়ের দৃষ্টি-ভাবনার প্রভাব গিয়াস কামাল চৌধুরীর মধ্যে খুঁজিনি! কিন্তু শাহনওয়াজ ভাইয়ের বয়ানে দীর্ঘ বছরের গোপনে জমে থাকা এক সুতো পরিমাণ কল্পিত অভিযোগ ভুলে এক মানবিক ও উদারনৈতিক প্রকৃতপক্ষেই দরদী একজন গিয়াস কামাল চৌধুরীর স্পষ্ট ছবিটি দেখতে পেয়ে এক ধরনের অদৃশ্য স্বস্তি ও ভালোবাসা কাজ করছে আমার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথের সেই গানটির মতো- মোর ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো, দোলে মন অকারণ হরষে! প্রেস ক্লাবে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানাদিতে সাধারণের চেয়ে একটু উন্নতমানের খাবারের আয়োজন থাকতো। ক্লাবের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আলাদাভাবে না খেয়ে গিয়াস কামাল চৌধুরী খেতে বসছেন প্রেস ক্লাবের সব শ্রমিক কর্মচারীদেরকে সঙ্গে নিয়েই। তিনি নিজে খাবারের দিকে মনোনিবেশ না করে উদগ্রীব হয়ে খেয়াল রাখতেন সব শ্রমিক কর্মচারীরা ঠিকমতো খাচ্ছে কি না। ভাত কমিয়ে মাংস বেশী খাওয়ার দিকে উৎসাহিত করতেন প্রায় প্রত্যেক শ্রমিক কর্মচারীদের। মাংস কি আর প্রতিদিন খেতে পাবে! মানুষের প্রতি গভীর ও নিবিড় ভালোবাসা না থাকলে এভাবে কে ভাববে!
৩.
শেখ শাহনওয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরি করেছেন। কিন্তু, মাঠ পর্যায়ে কিংবা সাংবাদিক হিসেবে লেখক হিসেবে যে অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না, একথা অকপটে বলেছেন শেখ শাহনওয়াজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এসে সাপ্তাহিক ঠিকানায় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মূলত মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত সাংবাদিকতার শুরু তাঁর। তৎকালীন ঠিকানায় থাকা অবস্থায়ই শেখ শাহনওয়াজ ভাইয়ের দেখা হয় সাংবাদিক আব্দুল বাসিতের সঙ্গে। আব্দুল বাসিত অসাধারণ স্মৃতিধর এক বিরল মানুষ, যার মুখে কথা নেই; অথচ, তাঁরই স্মরণ আয়নায় খোদাই হয়ে থাকতো ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডবদের অগণিত কবিতা। এ তো আমার নিজের শৈশব কৈশোর যৌবনকালের জানা দেখা অভিজ্ঞতা।
আব্দুল গাফফার চৌধুরীর একটি গল্প শেখ এই গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। গাফফার চৌধুরীর বয়ানে এই ছোট্ট গল্পের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজ বাস্তবতা। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের মনোভাব। দৈনিক আজাদ-এ চাকুরীকালীন আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সন্তানের নাম বাংলায় রাখায় গাফফার চৌধুরীকে তলব করে কৈফিয়ত চেয়েছেন সম্পাদক মওলানা আকরম খাঁ!
৪.
কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে গ্রন্থটি পাঠ করে তথ্যের সাথে ভাষার মনোহর বুনন, বাহুল্যকে বর্জন করে প্রয়োজনীয় বর্ণনার বিস্তার, ব্যক্তির মহিমাকে কর্মের নিক্তিতে মেপে প্রকাশের অকপট সাবলীলতা, বর্ণনার সঙ্গে আন্তরিকতার মিশেল, বিষয়ের বৈচিত্র্যময় সংযুক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি সহ গ্রন্থটি আমার কাছে সুখপাঠ্যই নয় শুধু, প্রাণের আরামেরও। গ্রন্থকারকে ব্যক্তিগতভাবে জানার সৌভাগ্যক্রমে বইটি আরো আরো আকর্ষণীয় আমার কাছে। ব্যক্তি শেখ শাহনওয়াজ একজন সৎ বিনয়ী ও আন্তরিক মানুষই নন শুধু, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও তিনি সততার সাথে একেকটি শব্দ উচ্চারণে কিংবা প্রয়োজনীয় বাক্যের উপর্যুক্ত শব্দটি ব্যবহারে গভীর মনোযোগী ও সচেতনও বটে। ফলে, তাঁর সান্নিধ্য হয়ে ওঠে বাহুল্যবর্জিত সঠিক তথ্যের সময়ের সত্যিকার আয়নায় পেছন ফিরে দেখার সুযোগ।
ডি আই টি মার্কেটের নিচে আপ্যায়ন রেস্তোরাঁয় শহীদ কাদরী, আবুল হাসান, সদ্য কলকাতা ফেরত বেলাল চৌধুরীর আড্ডা ও আড্ডায় রসাত্মক পাঠ করে এঁদের মুখচ্ছবিটিও যেন আমি দেখতে পাচ্ছি। কে না জানেন শহীদ কাদরীর ঝাঁঝালো কথার ধার, কিংবা যে কোন প্রসঙ্গে একেবারে পাত্র উল্টে রসের বিতরণ। সেইসময়ে বিচিত্রায় একটি প্রচ্ছদ কাহিনীর শিরোনাম ছিল ‘মেয়েদের চোখে ছেলেরা’। জরিপে দেখা গেল মেয়েরা কবিতা জানা ছেলেদের পছন্দ করে, কিন্তু কবিদের নয়। আপ্যায়নের আড্ডায় এই প্রসঙ্গে কথা শহীদ কাদরী বললেন – বুঝলে হাসান, ডাবের পানিটা খাবে, কিন্তু ছোবড়াটা ছুঁড়ে ফেলে দেবে!
পাবলিক লাইব্রেরির পেছনের বিখ্যাত শরিফ মিয়ার তৎকালীন ক্যান্টিনে আড্ডায় সমবেত হওয়া মুখের নামগুলো দেখছি আর এঁদের মুখচ্ছবিও সামনে ভেসে ওঠছে। আহমদ ছফা, সালাউদ্দীন জাকি, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, রফিক আজাদ, রফিক কায়সার, মুহম্মদ নুরুল হুদা, হেলাল হাফিজ, সেলিম আল দীন, সানাউল হক খান, অসীম সাহা, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, শিহাব সরকার প্রমুখ! এঁদের প্রত্যেকের কাছেই যে শেখ শাহনওয়াজ সম্পর্কে ভাই। কেননা, তিনি যে তাঁর প্রিয় টুকু ভাইজানের ছোট ভাই! কিন্তু, এই টুকু ভাইজানইবা কে?

৫.
টুকু ভাইজানের প্রসঙ্গে যাবার আগে, আমার একটি অপরাধবোধের কথা আগে স্বীকার করে নিই। শাহনওয়াজ ভাই প্রায়শই গল্পচ্ছলে এই টুকুজানের কথা গল্প করতেন। বলতেন তিনি তাঁর খালাতো ভাই। এও বলতেন তাঁর টুকুজানের নানি ও শাহনওয়াজ ভাইয়ের নানি দুই বোন। যেটুকু মনোনিবেশ করলে এই সম্পর্ককে ভালো করে সনাক্ত করে মনে রাখা যায়, বারবার শোনা সত্তে¡ও আমি তা মনে রাখতে পারিনি। এই বইটি পড়ে তাঁদের খালাতো ভাইয়ের পরস্পর সম্পর্কের সুতোটি ধরতে পেরেছি। আজ ভাবলে নিজের কাছে লজ্জিতবোধ করি একারণে যে, আমি কি শাহনওয়াজ ভাইয়ের মুখে বারবার বর্ণিত গল্পে মনোনিবেশ করিনি পুরোপুরি!
এখন আসি তাঁর টুকু ভাইজান প্রসঙ্গে। উপরের যা কিছু লেখা হয়েছে, তার মূলে এই একটি চরিত্র। এবং একথা এখন বলে নিই যে, লেখাটির শুরুতেই এই প্রসঙ্গটিই উল্লেখ করার বিষয় ছিল, প্রয়োজনও ছিল। আমি ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটি শেষ দিকে উল্লেখ করছি। ষাটের দশকে বাংলাদেশের কাব্য আন্দোলনে যে কয়টি নাম এখন পর্যন্ত জ্বলজ্বল করছে আবুল হাসান তাদের মধ্যে অন্যতম ও উল্লেখযোগ্য। কবিতা যন্ত্রণার নীল বেদনায় আবুল হাসান নিজেকে পুড়িয়ে যেন সমস্ত পৃথিবীকেই ভুলতে চেয়েছেন। ফকির সাধকের মতো ছন্নছাড়া জীবনের সঙ্গে গাঁঠছড়া বেঁধেছিলেন। কবিতা এবং একমাত্র কবিতাই আবুল হাসানকে ঘিরে রেখেছিল অথবা আবুল হাসানই জীবন ও জগতের উন্নতির সকল সিঁড়িকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র কবিতা নিয়েই যাপন করতে চেয়েছেন? স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নীলকন্ঠ কবি আবুল হাসানই শেখ শাহনওয়াজ ভাইয়ের অতি প্রিয় টুকু ভাইজান।
শেখ শাহনওয়াজ বলছেন তাঁর টুকু ভাইজানকে দেখতে ১৯৭২ সালে খুলনা থেকে ঢাকা এসেছিলেন। দৈনিক জনপদ পত্রিকার একটি বিভাগের সম্পাদকীয় দায়িত্বে ছিলেন আবুল হাসান। বাংলা বাজারে তখন দৈনিক জনপদ-এর অফিস ছিল। আব্দুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদক।
১৯৭৩ সালে তিনি খুলনা থেকে ঢাকা এলেন পড়াশোনা করতে। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। শেখ শাহনওয়াজ অকপটে এক জায়গায় বলছেন – ঢাকায় আসি মূলত আবুল হাসানের টানে!
৬.
কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে গ্রন্থখানির প্রতিটি শব্দে বাক্যে পঙক্তিতে পঙক্তিতে আবুল হাসান; অর্থাৎ, তাঁর প্রিয় টুকু ভাইজানের মুখখানি লেপ্টে আছে? যেন প্রতিটি বাক্যের মাঝখানে এক অবারিত মাঠের আলপথ, যে পথ ধরে অবিশ্রান্তভাবে হেঁটে চলেছেন আবুল হাসান। পেছন থেকে দৌড়ে এসে তাঁর গতির সাথে তাল মিলিয়ে যাত্রাপথের সমতা আনতে না পারায় আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে শেখ শাহনওয়াজ ভাই ডেকে চলেছেন – ভাইজান, ভাইজান!
পড়া শেষ করে এই বইয়ের মলাটের ভাজ বন্ধ করলেও এর ভিতরে উঁকি মারা কিছু মুখ ও তাদের কথোপকথন আমাকেও ঘুমুতে দেবে না, আমি জানি। আমি যে দেখতে পাচ্ছি, আবুল হাসানকে ডেকে নিয়ে আহসান হাবীবের হাতে দুজনের কবিতা দিয়ে সারারাত দৈনিক বাংলার নিচে রাস্তায় চা দোকানের বেঞ্চিতে বসে রইলেন নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসান। সম্পাদকের হাতে দেওয়া সদ্য লিখিত কবিতা পত্রিকায় ছাপা হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে জেগে আছে – কবি কীভাবে কবিতাকে জাগিয়ে রেখে ঘুমান!
আমি আজ সারারাত জেগে থাকবো!
দেলওয়ার এলাহী, টরন্টো

