দেলওয়ার এলাহী : শিল্পের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো চিত্তের আনন্দ। চিত্তাকর্ষক শব্দটি তখনই প্রয়োগ হয়, যখন চিত্তকে কোন বস্তু, দৃশ্য, বিষয়, শিল্প আকর্ষণ করে। বিনোদনকে উপজীব্য করে তারপর এর মর্মমূলের নিহিত উদ্দেশ্য, দর্শন, প্রেক্ষিত, স্থান কাল সময়কে বাঁধতে পারেন বিস্তারের আলাপকে টেনে ধরে। গতকাল, অর্থাৎ ১৩ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়, টরন্টোয় আবৃত্তি সংগঠন ‘কণ্ঠচিত্রণ’-এর ৩য় বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে আয়োজিত পরিবেশনা উপভোগ করেছিলাম আর ভাবছিলাম এই বিষয়গুলো। কণ্ঠচিত্রণের অনুষ্ঠানটির পরিবেশনা একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চিত্তজাগানিয়া আনন্দময় ছিল। পরিবেশনার শিকলে বাঁধা সময় দীর্ঘসূত্রিতার প্রহারে অত্যাচারিত হয়ে ওঠেনি। বাহুল্যচর্চিত উপস্থাপনাকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে দর্শকশ্রোতা ও নিজেদের সময়কে মূল্যায়ন করেছেন কণ্ঠচিত্রণের বন্ধুরা। এমনকি ইতিউতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দর্শকশ্রোতাদের গুঞ্জরণকে উপেক্ষা করে সহসা মূল অনুষ্ঠানে পরিবেশনায় প্রবেশ করে কণ্ঠচিত্রণ এই বার্তা দিয়েছেন যে, মনোযোগ আকর্ষণ করতে ও নীরবতার পরিবেশ আনতে আহবান-অনুরোধ করতে হয় না। শিল্পের শক্তি নিজে থেকেই মর্মমূলে প্রবেশ করে সব মনোযোগ কেড়ে চারদিক নীরব করে দেয়।

কবিতা কী? কবিতা কেন? কবিতার মর্মবাণী-ই-বা কী? এই বিষয়ে কবি, কাব্য বিশারদ, নন্দনতাত্তি¡ক কিংবা কাব্য সমালোচকদের কারো কারো উক্তি অংশত ঠিক, স্বতসিদ্ধ নয় মোটেই। এখন পর্যন্ত কবিতার স্পষ্টত ও সম্পূর্ণত উত্তর স্বয়ং কবিতা বা কবিতা নিজে। অতএব, কবিতা কী, কেন, এবং এর উদ্দেশ্যের বন্দনা, ভ‚মিকা, নান্দীমুখ একেবারেই বাহুল্য, কণ্ঠচিত্রণের পরিবেশনায় তা আবারও প্রমাণিত হলো।
বর্তমান সময়ে; অর্থাৎ, ২০২৪ সালের আগস্টের পরে বাংলাদেশের মানুষের, সেটা দেশেই হোক কিংবা প্রবাসে, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক আয়োজনে দুটি বিষয় স্পষ্টতই প্রণিধানযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশের পক্ষের দর্শনকে নিহিতবোধ রেখে অথবা এর বিপরীতে। কণ্ঠচিত্রণের পরিবেশনা প্রমাণ করেছেন কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক চর্চার দর্শনে তাদের নিহিতার্থ কী! দর্শকশ্রোতারাও বিপুল করতালিমুখর আনন্দে কণ্ঠচিত্রণের পরিবেশনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বারবার সাধুবাদ দিয়েছেন? ‘আমার পরিচয়’ কবিতার বৃন্দ আবৃত্তির সময় যখনই উচ্চারিত হলো – ‘যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান’ দর্শক-শ্রোতারা করতালিতে ফেটে পড়েছেন!

২.
চর্যাপদ থেকে হালের রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র কবিতা দিয়ে সাজিয়েছেন কণ্ঠচিত্রণের পরিবেশনা? দেশাত্মবোধক গানের অংশ কবিতার পরিবেশনাকে বিস্তারের সূত্র হিসেবে কাজ করেছে?
সমস্থ পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাস আক্রমণ শুরু হওয়ার আগে কণ্ঠচিত্রণ আত্মপ্রকাশ করে? সেই সময় কণ্ঠচিত্রণের আত্মপ্রকাশকে সাধুবাদ জানিয়ে অভিভাবকের ভ‚মিকায় থেকে শুভকামনা জানিয়েছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী। মাঝখানে করোনার আক্রমণে পৃথিবী তছনছ হয়ে গেল। অগণিত মানুষ অকালে চলে গেলেন চোখের আড়ালে। প্রকৃতির অমোঘ হাতছানির অবধারিত ডাকে সাড়া দিয়ে আসাদ চৌধুরীও চলে গেলেন চোখের আড়ালে। কণ্ঠচিত্রণ কবিকে সম্মান দেখিয়েছেন তাঁর স্মরণে ও সম্মানে একেবারে প্রথম সারির একটি আসনে কবির প্রতিকৃতি টাঙিয়ে রেখে।
কণ্ঠচিত্রণের সৌভাগ্য তাদের পরিবেশনায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের আবৃত্তির অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠান শেষে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিক্রিয়ায় কণ্ঠচিত্রণের পরিবেশনার ভ‚য়সী প্রশংসা করেন? বিশেষ করে কণ্ঠচিত্রণের পরিবেশনায় বাঙালির জাতিগত পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ভাবনাকে স্যালুট জানান তিনি? ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর শ্রদ্ধায় কবি আসাদ চৌধুরীকে স্মরণ করেন। কবির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বছরের ব্যক্তিগত সম্পর্কের আলোকপাতও করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়।

অনুষ্ঠান শেষে কণ্ঠচিত্রণের আত্মপ্রকাশের সময়ে থাকা দুইজন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য শেখর-ই-গোমেজ ও হিমাদ্রী রায়কে মঞ্চে আহবান করলে তারা এখনও কণ্ঠচিত্রণ পরিবারের সদস্য হিসেবে নিজেদেরকে বিবেচনা করেন বলে তাদের প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেছেন? অনুষ্ঠানের পরিবেশনার নির্মেদ বাহুল্যবর্জিত পরিমিতিবোধকে ও এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের পক্ষে পরিবেশনার গ্রন্থনার প্রশংসা করেন আরো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আহমেদ হোসেন, নওশের আলী, জামিল বিন খলিল ও দেলওয়ার এলাহী। কণ্ঠচিত্রণের আয়োজকদের পক্ষে সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাশে থাকার জন্য ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তাদের পরিবেশনা উপভোগ করার জন্য অফুরান ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানান এলিনা মিতা। পরিচিত নাম ও চেনা মুখের বাইরেও যে কত অসাধারণ আবৃত্তিকার ও সংগঠক এই শহরে ছড়িয়েছিটিয়ে আছেন, এর প্রমাণ কণ্ঠচিত্রণের গতকালের আয়োজনে অনেক নতুন মুখের সমাহার! সাধু সাধু! জয়তু কণ্ঠচিত্রণ।
যে সব সদস্যরা আমার পরিচয় অনুষ্ঠানে পরিবেশনা করেছেন : এলিনা মিতা, অপর্ণা গোমেজ ,শঙ্কু পুরকায়স্থ শান, নুসরাত জাহান শাঁওলী, সিরাজী খান, শালোমী হালদার দোলা, ফ্লোরেন্স মিঠু, আশরাফুন নাহার ঝুমুর, মার্ক রোজারিও, তেরেজা দিপীকা, রোমিও গোমেজ; শরীফ আহমেদ এবং শারমিন শরীফ।
গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় ছিলেন : শঙ্কু পুরকায়স্থ, সহযোগিতায় এলিনা মিতা।
তবলায় সঙ্গত করেছেন : মার্ক রোজারিও
হারমোনিয়াম এ ছিলেন রোমিও রোজারিও।
ব্যানার, পোষ্টার, ভিডিও ক্লিপিং, সাউন্ড এবং লাইট এ সহযোগিতা করেছেন সি এন্ড এম সাউন্ড এর ক্যারী খ্রিষ্টফার রোজারিও।

