Thursday, May 21, 2026
Thursday, May 21, 2026
Home ইন্টারন্যাশনাল বেঁচে থাকতে সন্তান বিক্রি করছে আফগানরা

বেঁচে থাকতে সন্তান বিক্রি করছে আফগানরা

অনলাইন ডেস্ক : অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত আফগানিস্তানের মানবিক বিপর্যয় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে দেশটির ঘোর প্রদেশের পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক। প্রদেশটির বেশিরভাগ বাবা-মায়েরা খাবার কিনতে এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের বাঁচিয়ে রাখতে নিজেদের অল্পবয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহ বা গৃহকর্মে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারানের বিভিন্ন রাস্তায় ভোর থেকেই শত শত মানুষ কাজের খোঁজে জড়ো হন। তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ যদি কাজের সুযোগ দেয়। কিন্তু কাজ মেলে খুব কম। কারণ একটি দিনের কাজই নির্ধারণ করে দেয়, সেদিন তাদের পরিবার খাবার পাবে কি না। কিন্তু অধিকাংশ দিনই তারা খালি হাতে বাড়ি ফেরেন।

চাঘচারানের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী জুমা খান জানান, গত ছয় সপ্তাহে তিনি মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। আর এই তিন দিনে দৈনিক মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি (২.৩৫-৩.১৩ ডলার) পারিশ্রমিক পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘টানা তিন রাত আমার সন্তানরা না খেয়ে ঘুমিয়েছে। আমার স্ত্রী কাঁদছিল, শিশুরাও কাঁদছিল। আটা কেনার জন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। আমার ভয় হয়, আমার সন্তানরা ক্ষুধায় মারা যাবে।’

আক্ষেপের সুরে জুমা আরও বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ভয় পাই যে আমার সন্তানরা হয়তো না খেয়ে মারা যাবে।’

জুমার মতো চাঘচারানের হাজার হাজার দিনমজুরে পরিস্থিতি একই রকম।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। দেশটিতে বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা একসময় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটালেও, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, বর্তমানে আফগানিস্তানের প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-দশমাংশের বেশি। আর ঘোর প্রদেশ সংকটের সবচেয়ে বড় শিকারদের মধ্যে একটি।

চাঘচারানের আরেক বাসিন্দা রাবানি জানান, ‘রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘ফেনো খবর পেয়েছিলাম আমার সন্তানরা দুই দিন ধরে কিছু খায়নি। এতে আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তারপর ভাবলাম, তাতে আমার পরিবারের কী উপকার হবে? তাই এখানে কাজের খোঁজে এসেছি’।

খাজা আহমদ নামে আরেক বৃদ্ধ দিনমজুর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে বলেন, ‘আমরা ক্ষুধার্ত। আমার বড় সন্তান মারা গেছে, তাই এখন জীবন বাঁচাতে কাজ করতে চাই, কিন্তু বয়স বেশি হওয়ায় কেউ কাজ দেয় না।’

এদিকে চারচাঘানের নিকটবর্তী জনপদগুলোতে—সিয়াহ কোহ পর্বতশ্রেণীর তুষারাবৃত পাহাড়ের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাদামাটা বাড়িগুলোতেও—বেকারত্বের বিধ্বংসী প্রভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানেই এক জীর্ণ ঘরে বাস করেন আব্দুল রশিদ আজিমি।

সাত বছর বয়সী যমজ কন্যাসন্তান রোকিয়া ও রোহিলাকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত। আমি দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত এবং সম্পূর্ণ অসহায়। কাজ না পেয়ে যখন তৃষ্ণার্ত আর বিভ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরি, সন্তানরা এসে বলে বাবা, একটু রুটি দাও। কিন্তু আমি কোথা থেকে দেব? কাজ কোথায়?

কাঁদতে কাঁদতে আজিমি বলেন, ‘যদি আমি একটি মেয়েকে বিক্রি করি, তাহলে আমার বাকি সন্তানদের অন্তত চার বছর ভরণপোষণ করতে পারব। যদিও আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু এটাই একমাত্র উপায়।’

তার স্ত্রী কায়হান বলেন, ‘পরিবারে খাবার বলতে প্রায় শুধু রুটি আর গরম পানি।’

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বিক্রি করার কারণ হলো, সাংস্কৃতিকভাবে ছেলেদেরকে ভবিষ্যতের উপার্জনকারী হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হয় এবং এখানে আফগানিস্তানে, নারী ও মেয়েদের শিক্ষা ও কাজের ওপর তালেবানদের বিধিনিষেধের কারণে এই বিষয়টি আরও প্রকট। এছাড়াও, এমন একটি প্রথা প্রচলিত আছে যেখানে বিয়ের সময় ছেলের পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়ের পরিবারকে বৈবাহিক উপহার দেওয়া হয়।

আরেক ব্যক্তি সাঈদ আহমদ জানান, অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও লিভারে সিস্ট হওয়ার পর তিনি তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শাইকাকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি বলেন, চিকিৎসার খরচ দেওয়ার মতো টাকা আমার ছিল না। তাই মেয়েকে ২ লাখ আফগানিতে এক আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম, যা দিয়ে তার অস্ত্রোপচারের খরচ দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতে মেয়েটিকে ওই পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার হবে বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২১ সালে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের পর, আন্তর্জাতিক দাতারা সাহায্য ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে বা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। এতে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি বেকারত্ব, খরা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভাঙন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূত্র: বিবিসি

RELATED ARTICLES

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কাউকে দেবে না ইরান, নির্দেশ খামেনির

অনলাইন ডেস্ক : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় নিয়ে নিরাপদ সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে আংশিক সম্মতি জানিয়েছিল। তবে নিজেদের...

নিজেকে ‘চা ওয়ালা’ বললেন মোদি

অনলাইন ডেস্ক : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেকে চা ওয়ালা হিসেবে অভিহিত করেছেন। বুধবার (২০ মে) ইতালির রোমে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি ইভেন্টে...

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণের প্রশ্নই ওঠে না: ইরান

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটি মনে করছে, যুদ্ধের পথে না গিয়ে...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

ইবোলা আতঙ্কে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি শিবির বাতিল কঙ্গোর

স্পোর্টস ডেস্ক : ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বকাপ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নির্ধারিত তিন দিনের অনুশীলন ক্যাম্প ও রাজধানী কিনশাসায় সমর্থকদের বিদায়ী অনুষ্ঠান বাতিল করেছে...

দ্রুতই রামিসা হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে

অনলাইন ডেস্ক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্পন্ন...

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কাউকে দেবে না ইরান, নির্দেশ খামেনির

অনলাইন ডেস্ক : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় নিয়ে নিরাপদ সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে আংশিক সম্মতি জানিয়েছিল। তবে নিজেদের...

নিজেকে ‘চা ওয়ালা’ বললেন মোদি

অনলাইন ডেস্ক : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেকে চা ওয়ালা হিসেবে অভিহিত করেছেন। বুধবার (২০ মে) ইতালির রোমে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি ইভেন্টে...

Recent Comments