অনলাইন ডেস্ক : ঢাকা, নয়াদিল্লি, হ্যানয় কিংবা জাকার্তা। পাল্টা শুল্কের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা অধিকাংশ দেশ এশিয়া অঞ্চলের। গ্লোবাল ট্রেড অ্যালার্ট দেখাচ্ছে, গত শুক্রবারের আগে হওয়া ২১টি চুক্তির ১৩টিই করেছে এশিয়ার দেশগুলো।
প্রশ্ন উঠতে পারে এশিয়ার দেশগুলোই কেন এভাবে চুক্তির দৌড়ে নেমেছিল? এর প্রধান কারণ উৎপাদন। কৃষি থেকে শুরু করে রপ্তানিমুখী বেশিরভাগ পণ্য এ অঞ্চলের দেশগুলোতে উৎপাদন হয়। ফলে পাল্টা শুল্কের খড়গ সামলাতে নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে ভারত, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড। সঙ্গে বাংলাদেশও।
গত শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্কের বৈধতা বাতিলের পরও এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ায় সাবধানতার লক্ষণ দেখা গেছে। শুল্কের চাপের মুখে চুক্তির জন্য তাড়াহুড়া এবং আদালতের রায় পক্ষে যাওয়ার পরও সাবধানতা অবলম্বনের এই আচরণকে তুলনা করা যেতে পারে ‘রুস্টার কুপ’ বা ‘খাঁচার মোরগ’ তত্ত্বের সঙ্গে।
‘রুস্টার কুপ’ তত্ত্ব আসলে কী?
২০০৮ সালে প্রকাশ হওয়া একটি বইয়ের গল্প অবলম্বনে ২০২১ সালে মুক্তি পায় ভারতীয় সিনেমা ‘দ্য হোয়াইট টাইগার’। লেখক অরবিন্দ আদিগা তাঁর বইয়ে প্রতীকী অর্থে ‘রুস্টার কুপ’ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। সিনেমায় সেটি প্রকাশ পায় বলরাম নামের এক চরিত্রের সংলাপে।
সিনেমায় বলরাম বলেন, ‘এই দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ জিনিসটি হলো, মোরগের খাঁচা (রুস্টার কুপ)। খাঁচার ভেতরে থাকা মোরগগুলো বাইর থেকে রক্ত আর নাড়িভুঁড়ির গন্ধ পায়। তারা তাদের ভাইদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পড়ে থাকতে দেখে। এরপর যে তাদের পালা আসছে, সেটি জেনেও তারা বিদ্রোহ করে না। খাঁচা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে না। এই দেশের মানুষের সঙ্গেও ঠিক একই কাজ করা হচ্ছে।’
সংলাপটির বাস্তব উদাহরণ হলো, বাজারের মোরগের খাঁচা। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী একের পর এক মোরগ (বা মুরগি) বের করে জবাই করেন বিক্রেতা। খাঁচার ভেতরে থাকা মোরগগুলো সেটি দেখে। দোকানি খাঁচার দরজা খুলে রেখে আরেকটি মুরগি ধরতে গেলেও বাকিরা খাঁচার মুখ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে না। বরং খাঁচার আরও ভেতরের দিকে গিয়ে নিজেদের মতো ছোঁটাছুটি করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের চাপ ও আদালতের রায়ের পরও একই রকম ঘটনা ঘটছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট- আসিয়ান থাকলেও সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কিছু করছে না। বরং যে যার মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। জোটের বাইরের দেশগুলোও এই দৌড়ে সামিল হয়। জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের কৃষির বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। আর তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো শুল্কহীন পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাল্টা শুল্ক কমানোর চেষ্টা করে।
কেন এমন আচরণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা শুল্ক আরোপের পর বহুল প্রচলিত একটি শব্দগুচ্ছ সামনে আসে- ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’। কিন্তু এটি এমন এক যুদ্ধ যেখানে কেউই মার্কিন আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বি হওয়ার চেষ্টা করেনি বা করছে না। বরং কতটা ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তুলে চড়া মূল্যে ‘মুক্তি’ কেনা যায় সে চেষ্টায় লিপ্ত ছিল।
গ্লোবাল ট্রেড অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ওপর পাল্টা শুল্কের হুমকি ছিল যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৯ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবরে এই দুই দেশ তড়িঘড়ি করে মার্কিন জ্বালানি ও উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে নিজেদেরকে বাণিজ্য যুদ্ধের ‘শত্রু’ তালিকা থেকে সরিয়ে নেয়। পরে পাল্টা শুল্ক যথাক্রমে ২০ ও ১৯ শতাংশে নামে।
একইভাবে আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া ৩২ থেকে ১৯ এবং বাংলাদেশ পাল্টা শুল্ক ৩৫ থেকে ১৯ শতাংশে নামিয়েছে।
বাংলাদেশ বাদে আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো যেমন- ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশ রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৮ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ৩৬ শতাংশ। ফলে রপ্তানির বাজার টিকিয়ে রাখতে দেশগুলো তড়িঘড়ি করে চুক্তি করে। অথচ গত এক বছরেও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণের স্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি।
কেন পাল্টা লড়াই করছে না?
গ্লোবাল ট্রেড অ্যালার্ট, আইএমএফের রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক (অক্টোবর, ২০২৫) এবং ইউএনডিপির প্রতিবেদন বলছে, একক গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীলতা, পাল্টা শুল্কের ফাঁদ এবং চীনের ‘ব্যাকডোর (পণ্য সরবরাহের বিকল্প রুট)’ তকমার ভয়ে পাল্টা লড়াই দেখা যাচ্ছে না।
বার্তা সংস্থা এএফপি সম্প্রতি তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, পাল্টা শুল্ক বাতিলের খবর অনেকের কাছে স্বস্তির হলেও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা আগামী কয়েক মাস থাকতে পারে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্য আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ)’ -এর মাধ্যমে আরোপ করা শুল্ক। এটি বাতিল হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, চুক্তি করা অনেক অংশীদার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করবে।
তবে থিংকট্যাঙ্ক এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ওয়েন্ডি কাটলার সম্প্রতি এএফপিকে বলেছেন, ঘোষিত চুক্তিগুলো থেকে অংশীদাররা সরে যাবে না। তারা খুব ভালো করেই জানে, এমন পদক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিরূপ হবে।
আদালতের রায়ের পরপরই ট্রাম্প বিকল্প ক্ষমতাবলে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছেন। যা মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি বলেছেন, বাণিজ্য চুক্তি করা দেশগুলোর জন্য পুনরায় একই পর্যায়ের শুল্ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, চুক্তি নিয়ে টালবাহানা করলে তিনি উচ্চ শুল্ক আরোপ করবেন।
এমন অনিশ্চয়তার মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করেছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে ডয়চে ভেলে। কিন্তু শক্তিশালী জোট না থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এশিয়ার দেশগুলো যেন ‘খাঁচার মোরগদের’ মতোই আতঙ্কিত। এই আতঙ্ক তাদের আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল মজবুত করা কিংবা ঐক্যবদ্ধ হতে দিচ্ছে না। ফলে মার্কিন নির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়ার সুযোগ না খুঁজে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিকে নিরাপদ মনে করছে।
