দেলওয়ার এলাহী : এরকম একটি কথা শুনি যে, ঢাকার-কলকাতার পরে টরন্টো বাংলা সংস্কৃতি চর্চার একটি উল্লেখযোগ্য শহর। অগ্রগণ্য মনীষীরা এখানে এসে একথা বলেছেন অনেকবার। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার এই যে আলোড়ন, আমার ধারণা, তারও একটি তুল্যমূল্য মাপকাঠি আছে। এই শহরের সংস্কৃতি কর্মীরা প্রতিনিয়ত চর্চা ও চেষ্টা করে চলেছেন সেই মাপকাঠির পারদকে উচ্চতায় নিয়ে যেতে। বাংলা ভাষাভাষী একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এই সুযোগে টরন্টো শহরের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই, শুভেচ্ছা জানাই।
সংস্কৃতি চর্চার অন্যান্য অনেক শাখার মতো কবিতা আবৃত্তির বিষয়টিও এই শহরের আবৃত্তি শিল্পীরা এক উল্লেখযোগ্য সফলতায় নিয়ে গেছেন? তারই ধারাবাহিকতায় আরেকটি সফল সন্ধ্যা উপহার দিলেন হিমাদ্রী রায় ‘কবিতাস্নাত জীবন’ শিরোনামে। এখানে উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না যে, হিমাদ্রী রায়ের কবিতা মগ্ন বা লগ্ন জীবনযাপনে শিরোনামটি যথার্থ।
একজন আবৃত্তি শিল্পী অনেকগুলো সংখ্যক কবিতা স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করবেন, করেছেন এটা অবশ্যই একজন আবৃত্তিশিল্পীর জন্য একটি সফলতার মাপকাঠি। কিন্তু, একমাত্র মাপকাঠি নয়। এই মাপকাঠিকে পুঁজি করেননি বলেই হিমাদ্রী আবৃত্তির ক্ষেত্রে পরিচিতি পাওয়ার অনেক বছর থেকে অধ্যবসায় সাধনায় নিজের প্রস্তুতির চর্চাকে চালিয়ে গিয়েছেন একান্ত নিমগ্নতায়। তার এই একান্ত নিমগ্ন সাধনা কতটুকু সফল হয়েছে তা প্রত্যক্ষ করে অনন্য এক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করেছেন এই শহরের কবিতা আবৃত্তি প্রেমি ও সংস্কৃতিবান্ধব অগ্রসর সুধীমহল।
২.
‘কবিতাস্নাত জীবন’ শিরোনামের অনুষ্ঠানটির মঞ্চ ভাবনা ও মঞ্চসজ্জা করেছেন মাসুম রহমান। রঙের নমিত ব্যবহার, আলোর পরিমিত স্ফুরণ, দেশজ নানান অনুষঙ্গের ব্যবহারে শিল্পের শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছিল মঞ্চসজ্জার নান্দনিক আবহে। অনুষ্ঠানটি সাবলীল সুন্দর সুখ শ্রাব্য সঞ্চালনায় ছিলেন আরিয়ান হক। প্রচারণার শুরুতেই উল্লেখ হিমাদ্রী উল্লেখ করেছেন ‘কবিতাস্নাত জীবন’ শিরোনামের আবৃত্তিকৃত অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণকারী দর্শকশ্রোতার দেয় সবটুকু সম্মানী জেনেভা সেন্টার ফর অটিজম ফাউন্ডেশনের গবেষণার জন্য প্রদান করে দেবেন? অনুষ্ঠানের শুরুতেই জেনেভা সেন্টার ফর অটিজমের টরন্টো প্রধান জেনিস নেইডিনের কাছে ২৪ শত ডলারের চেক হস্তান্তর করে হিমাদ্রী তার প্রতিশ্রæতি রক্ষা করেছেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবিতাস্নাত জীবন শিরোনামের অনুষ্ঠানের অর্থ সাহায্যকারী কমিউনিটির জনপ্রিয়মুখ ব্যারিস্টার শামীম আরা ও সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর।

হিমাদ্রী রায়ের কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন আমাদের কমিউনিটির গর্ব অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদ সদস্য বাংলা সংস্কৃতিঅন্তপ্রাণ ডলি বেগম। ডলি বেগম তাঁর বক্তব্যে হিমাদ্রী রায়ের আবৃত্তি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লব্ধ অর্থ অটিজম চিকিৎসার সাহায্যে প্রদানকে মহৎকর্ম বলে উল্লেখ করে হিমাদ্রী রায়ের এই ভাবনাকে কৃতজ্ঞতার সাথে সাধুবাদ জানান।
৩.
হিমাদ্রী রায়ের আবৃত্তির পরিবেশনায় কীবোর্ড পিয়ানোতে সুরসঙ্গত করেন রূপতনু শর্মা। এই শহরের সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের কাছে রূপতনু শর্মা এক মুগ্ধতার নাম। শিল্পীদের কাছে নির্ভরতায় সুর সঙ্গতের এক ভরসার নাম? তাই রূপতনু শর্মা যে আবৃত্তির আবহসঙ্গীত সৃষ্টিতে মধুর সুরের ঐন্দ্রজালিক মূর্ছনার সৌরভ ছড়িয়ে দেবেন, এ যেন সবারই অভিজ্ঞতালব্ধ প্রত্যাশা। রূপতনু শর্মা সেই মূর্ছনায় হিমাদ্রী রায়ের উচ্চারিত আবৃত্তিকে অনন্য মাত্রায় উত্তীর্ণ করে প্রথমেই স্বর্গীয় শান্তির আহবানে শ্রবণেন্দ্রিয়কে তন্ময়তায় প্রস্তুত করে দিলেন। তাঁর ভরাট ও পরমের কাছে আকুলিভ‚ত কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়লো হলরুমের সকল মানুষের কান থেকে প্রাণে প্রাণে। এ যেন সবার কাছে নতুন এক রূপতনু শর্মা। যেন বহু বছরের চেনা হিমাদ্রী রায়কে নতুন করে চেনাজানার অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আহবানে অগ্রিম ইশারা!
৪.
আদিকবি বাল্মিকী থেকে সমকালের রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র কবিতা সাজিয়ে একে একে পরিবেশন করলেন হিমাদ্রী রায়। অনায়াস, সাবলীল, কিন্তু প্রতিটি কবিতার তলদেশস্পর্শী তরঙ্গের দোলায় ভেসে শ্রোতাকে টেনে নিলেন নিজের বোধ ও আবেগের স্রোতের সাথে ভাসিয়ে ভাসিয়ে; প্রাণ আকুল করা মাটিলগ্ন আর্তির সাথে উত্তুঙ্গ ভাবনার বিদ্রোহের প্রবল প্রতাপে? এই পরিবেশনায় যারা নিমগ্ন হয়ে শুনেছেন তাদের অন্তর ছুঁয়ে গেছে। অনন্য এক মাত্রায় আনন্দে মন ভরিয়ে দিয়েছে। আবৃত্তির পুরো অনুষ্ঠান, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, পিনপতন নীরবতায় হিমাদ্রীর কণ্ঠে আবৃত্তি ধ্বনিতে নিমগ্ন হয়ে অনড়ভাবে বসেছিলেন সকল শ্রোতাদর্শক।
৫.
কে না জানে আমাদের দেশ আজ বিপন্ন। স্বাধীনতার শত্রুদের ছত্রছায়ায় শহীদের রক্তে ভেজা মাটি আজ আবারও সা¤প্রদায়িকতার ছোবলের ফণা তুলে ফুঁসে ওঠছে। এমতাবস্থায় যে কোন সচেতন মানবতাবাদী সংস্কৃতিকর্মীই মানবতার উচ্চারণ করবেন। আপন জাতিসত্তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জয়গান গাইবেন। হিমাদ্রী পরিবেশনার শেষ পর্বে মঞ্চে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও অসা¤প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি তার আপসহীন অবিচল বিশ্বাসের কথা। হলভর্তি শ্রোতাদর্শক সবাই করতালির মাধ্যমে তার এই বিশ্বাসের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন বিপুলভাবে।
৬.
অনুষ্ঠানে মঞ্চের ডানপাশের উপরে দেয়ালে টাঙানো পর্দায় প্রজেক্টের মাধ্যমে কবি চৌধুরীর ছবি ভেসে ওঠছিল। কবি আসাদ চৌধুরী অবিস্মরণীয় স্মৃতি ও অমূল্য স্নেহসান্নিধ্য হিমাদ্রীর অন্তর জুড়ে বিরাজমান। কবির অদৃশ্য উপস্থিতি হিমাদ্রীর অনুভবে সারাক্ষণ।
৭.
এই শহরের বিপুলসংখ্যক আবৃত্তি শিল্পী ‘কবিতাস্নাত জীবন’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে হিমাদ্রীর একক আবৃত্তির আয়োজনকে সফল করে তুলেছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অসংখ্য কর্মী অনুষ্ঠানের সফলতার আনন্দ-গল্পে মুখর হয়ে ওঠেছিলেন। এ বড় মনোরম দৃশ্য। আমাদের প্রিয় শহর টরন্টোয় এরকম দৃশ্যের অবতারণা হোক বারবার! জয়তু হিমাদ্রী রায়।
দেলওয়ার এলাহী : কবি, টরন্টো

