অনলাইন ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে বহুল আলোচিত শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইরানে সীমিত আকারে সামরিক হামলার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ বজায় রেখে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার ব্যর্থতার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে বিভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে সীমিত আকারে হামলার পাশাপাশি পূর্ণমাত্রার বোমা হামলার বিষয়টিও উঠে আসে। তবে এমন বৃহৎ আকারের সামরিক পদক্ষেপ অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে—এই আশঙ্কায় সেটিকে আপাতত কম সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছে, যাতে তারা হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। অস্থায়ী অবরোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নজরদারি জোরদার করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ তৈরির একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি সরাসরি সংঘাত চান না, কিন্তু প্রয়োজনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তার ভাষায়, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মতো স্থাপনাগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ওলিভিয়া ওয়েলস জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অন্যান্য সব বিকল্প খোলা রেখেছেন। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ব্যর্থ হলেও তারা চাপ প্রয়োগের কৌশল থেকে সরে আসছে না।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যৎ যেকোনো আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন কয়েকটি কঠোর শর্ত নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা, কোনো ধরনের টোল আরোপ না করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে অংশগ্রহণ এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার দাবিও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধই ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে কার্যকর চাপ সৃষ্টির উপায় হতে পারে। কারণ ইরানের অর্থনীতির বড় একটি অংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, যার প্রধান রুট এই প্রণালী। ফলে এই পথ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে তেহরানের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তবে এই কৌশলের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে। হরমুজ প্রণালী একটি সংকীর্ণ জলপথ হওয়ায় সেখানে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানি প্রতিনিধি দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য রেজা আমিরি মোগাদাম বলেছেন, ইসলামাবাদের আলোচনা ব্যর্থ হলেও এটি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তার মতে, পারস্পরিক আস্থা গড়ে উঠলে এই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর রূপ নিতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার এই দ্বিমুখী কৌশল পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে, যেখানে সামনে বড় ধরনের সংঘাত কিংবা সমঝোতা—দুই সম্ভাবনাই সমানভাবে খোলা রয়েছে। তথ্যসূত্র : ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

