অনলাইন ডেস্ক : গত ২৮ আগস্ট, বৃহস্পতিবার আনন্দ উচ্ছ¡াসে টরন্টোর ২২ লেবোভিক এভিনিউ’ সিনেপ্লেক্স ওডেন এ পর্দা নামলো ৮ম টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৫ এর। পাঁচ দিনব্যাপী এই চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়েছিল গত ২৪ আগস্ট, সোমবার একই স্থানে। আর অন্য তিন দিন অর্থাৎ ২৫, ২৬, ২৭ আগস্ট চলচ্চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল টরন্টোর ৩০০০ ড্যানফোর্থ এভিনিউ’র ‘মাল্টিকালচারাল ফিল্ম স্ক্রীনিং সেন্টার’ এ। এর মধ্যে দ্বিতীয় দিন ছিল শিশু চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী এবং শিশুদের জন্য একটি বিশেষ সেশন। পাঁচ দিনব্যাপী এই চলচ্চিত্র উৎসব প্রতিদিন শুরু হয়েছিল বিকাল ৬টায় এবং শেষ হয়েছিল রাত ১১টায়। টরন্টো ফিল্ম ফোরামের আয়োজনে ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর এই চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ভারত উপমাহাদেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের জন্ম শত বার্ষিকীতে এ চলচ্চিত্র উৎসব তাঁর প্রতি উৎসর্গ করা হয়। এবারের এই উৎসব উদ্বোধন করেন ঋত্বিক ঘটকের বোনের মেয়ে রীনা চক্রবর্তী। রীনা চক্রবর্তী প্রায় পাঁচ দশক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় শিক্ষকতায় পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন স্ক্যারবরো সাউথওয়েস্ট এর এমপিপি ডলি বেগম, স্ক্যারবরো সাউথওয়েস্ট এর সিটি কাউন্সিলর পার্থি কানডেভাল, ব্যারিস্টার চয়নিকা দত্ত এবং লিবারেল পার্টি অব কানাডা (অন্টারিও)’র সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হাফিজ। টরন্টো ফিল্ম ফোরামের প্রেস এন্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি মৈত্রেয়ী দেবী ও ফেস্টিভ্যালের ভলিন্টিয়ার সুকন্যা চৌধুরীর উপস্থাপনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্ব্বাগত বক্তব্য রাখেন টরন্টো ফিল্ম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ৮ম টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৫ এর সমন্বয়ক মনিস রফিক এবং সমাপনী বক্তব্য রাখেন টরন্টো ফিল্ম ফোরামের সভাপতি ও ৮ম টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৫ এর উৎসব পরিচালক এনায়েত করিম বাবুল।

শেষের দিনের সমাপনী অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন টরন্টো ফিল্ম ফোরামের অনুষ্ঠান সম্পাদক গৌতম শিকদার ও ভলিন্টিয়ার অরুনিম। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ব্রোকার শেখ হাসিব হোসেন, সমাজসেবক শহীদ খন্দকার টুকু, ব্যারিস্টার জয়ন্ত সিনহা, বিল বেøয়ার এমপি’র প্রতিনিধি সারোয়ার চৌধুরী ও তরুণ রাজনীতিবিদ তানভীর শাহনওয়াজ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের সামনে ভলিন্টিয়ার ও টরন্টো ফিল্ম ফোরামের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন টরন্টো ফিল্ম ফোরামের সভাপতি ও ৮ম টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৫ এর ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর এনায়েত করিম বাবুল। এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে ২৬টি দেশের ৪৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এই উৎসবে ৩৫ জন ভলান্টিয়ার অংশগ্রহণ করছে।
২০১৭ সালে ছিল কানাডার ১৫০তম বার্ষিকী। সেই বছরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ বহুজাতিক এই দেশটির প্রতি গভীর ভালোবাসা জানানোর জন্যই টরন্টো ফিল্ম ফোরামের এই চলচ্চিত্র উৎসবের নামকরণ করা হয় টরন্টো ‘মাল্টিকালচারাল’ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। এই চলচ্চিত্র উৎসবটি ইতোমধ্যে হয়ে উঠেছে পৃথিবীর স্বাধীন ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি গ্রহণীয় সংগঠন। এ বছর ১২২ টি দেশ থেকে এই চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য প্রায় ৪ হাজার বিভিন্ন দৈর্ঘ্য ও আঙ্গিকের চলচ্চিত্র জমা পড়েছে।
এবারের চলচ্চিত্র উৎসব উৎসর্গ করা হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতির প্রতি। এ বছরটি হচ্ছে ঋত্বিক ঘটকের জন্ম শত বার্ষিকী। ১৯২৫ সালের ৫ নভেম্বর ঋত্বিক ঘটক ঢাকায় জন্মেছিলেন। তাঁর বেড়ে উঠা ছিল পদ্মার তীরের রাজশাহী শহরে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তাঁর পরিবারকে রাজশাহী থেকে কলকাতায় চলে যেতে হয়। ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হয়ে যাওয়াকে ঋত্বিক কোনভাবেই মেনে নিতে পারেন নি। ‘ভাঙ্গা বাংলার দগ্ধ প্রাণ’ ঋত্বিক ঘটক কাছ থেকে, আর জীবন দিয়ে দেখে গেছেন জোর করে শেকড় থেকে উপড়ানো মানুষের দুঃখ, কষ্ট আর মানবেতর জীবনযাপন। ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে এসব মানুষের জীবনকে তুলে এনেছিলেন এক শৈল্পিক মহিমায়। তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমলগান্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) ও ‘যুক্তি তক্ক আর গপ্পো’ (১৯৭৪)’র মত সব কালজয়ী চলচ্চিত্র। ঋত্বিক ঘটক তাঁর চিন্তা চেতনা আর দর্শন এর প্রতি সবসময় সৎ ছিলেন এবং ব্যক্তি মানুষ সামষ্টিক ব্যাথা ধারণ করে আজীবন সাধারণ মানুষের সাথে পথ চলেছিলেন।

ঋত্বিক ঘটকের জন্মের একশ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি এতটুকু মলিন হন নি। বর্তমানে শুধু ভারত উপমহাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঋত্বিক ঘটক’কে নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা চলছে। আজ থেকে ষাট সত্তর বছর পূর্বে নির্মিত তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় ও নির্মাণ শৈলী নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবাচ্ছে পৃথিবীর চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের। ২০১৪ সালে টরন্টোতে ‘টরন্টো ফিল্ম ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার প্রধান আত্মিক শক্তি ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। এবারের এই চলচ্চিত্র উৎসবটি মহান চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের জন্ম শত বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি উৎসর্গ করতে পেরে টরন্টো ফিল্ম ফোরামের সকল সদস্য আনন্দিত ও তৃপ্ত।
৮ম টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৫ এর অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হিসেবে এই সংবাদে ব্যবহৃত সকল ছবি তুলেছেন জিসান সুলতানা।

