অনলাইন ডেস্ক : ‘ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতের পর বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে বলে আভাস দেয়ার পর তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে, আর বড় ধরনের পতন হয়েছে শেয়ারবাজারে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে এনবিসি নিউজ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও উপসাগরীয় তেল স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি বাজারে।
সংঘাতের কারণে ভ্রমণ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তেহরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া জনপ্রিয় গন্তব্য দুবাইসহ বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার যাত্রী ও বিমানপণ্য আটকা পড়েছে। মার্কিন শেয়ারবাজারেও বড় ধসের ইঙ্গিত মিলেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক উদ্বোধনী ঘণ্টায় কোথায় লেনদেন করবে তা ২ শতাংশ কমেছে। ডাও জোন্স ফিউচার সর্বোচ্চ ৯৭০ পয়েন্ট পর্যন্ত পতনের ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রযুক্তি খাতনির্ভর নাসডাক ১০০ ফিউচার নেমেছে ২.৩ শতাংশ।
জ্বালানি বাজারে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। সোমবার বড় উল্লম্ফনের পরও তেলের দাম বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৭.৫ শতাংশ বেড়েছে, ফলে রোববার রাতের পর থেকে মোট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। এতে তেলের দাম ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিশোধিত তেলের দামও ৮ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ হয়েছে।
তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে খুচরা জ্বালানি বাজারে। মঙ্গলবারের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে গড় পেট্রোলের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় ১৪ সেন্ট বেড়ে গ্যালনপ্রতি ৩ দশমিক ০৭৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসবাডির বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হ্যানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সপ্তাহ শেষে দাম গ্যালনপ্রতি ৩ দশমিক ১০ থেকে ৩ দশমিক ২০ ডলারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। মঙ্গলবার সকালে এর দাম ৪ শতাংশের বেশি লাফ দিয়েছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস ফিউচার লেনদেন বেড়েছে বিস্ময়কর ৪০ শতাংশ। এর আগে কাতারএনার্জি সোমবার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং মঙ্গলবার আরও কয়েকটি জ্বালানি পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করে।
বিশ্বের অন্যান্য শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইতালির এফটিএসই এমআইবি সূচক ৪ শতাংশ পড়ে গেছে। জার্মানির ডিএএক্স কমেছে ৩.৬ শতাংশ। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের প্রধান সূচকগুলোও প্রায় ২.৭ শতাংশ করে নেমেছে। ইউরোপের সামগ্রিক সূচক স্টক্স ৬০০ কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। এশিয়াতেও বড় ধস দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৭ শতাংশ পড়েছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ কমেছে ৩ শতাংশ। চীন, হংকং ও ভারতের শেয়ারবাজারও ১ শতাংশের বেশি হারিয়েছে।
লয়েডস ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের এই নেতিবাচক মনোভাবের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তীব্রতা ও বিস্তার। ইরান রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা চালিয়েছে, আর ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাদের ভাষায়, যুদ্ধ কতদিন চলবে এ বিষয়ে ট্রাম্পের দ্বিধান্বিত অবস্থান এবং অভিযানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।
সোমবার মার্কিন বাজার তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকলেও, রাতের অতিরিক্ত হামলা ও ট্রাম্পের নতুন মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ফলে তারা ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার থেকে সরে গিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন।
আইএনজির বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন মূল নজর থাকবে ইরান কি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদন স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা আরও জোরদার করতে পারে কি না। এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে বৈশ্বিক বাজারের দিক নির্ধারণ করবে।
