অনলাইন ডেস্ক : বিশ্ব সামরিক ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে রাশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও শক্তিশালী বিমান বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে চীন। পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স (পিএলএএএফ) এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আধুনিক যুদ্ধবিমান বহর পরিচালনা করছে। ওপেন-সোর্স সামরিক সমীক্ষা অনুযায়ী, চীনের বর্তমান যুদ্ধবিমান বহরে ২,০০০ থেকে ২,৫০০টি কমব্যাট এয়ারক্রাফট রয়েছে, যা সংখ্যার দিক থেকে রাশিয়ার এয়ারোস্পেস ফোর্সকে ছাড়িয়ে গেছে।
চীনের এই আকাশছোঁয়া অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি হলো তাদের পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার জেট কর্মসূচি। বর্তমানে পিএলএএএফ-এর কাছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি সচল **জে-২০ স্টিলথ ফাইটার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, চীনের উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর এই যুদ্ধবিমান তৈরির সংখ্যা ১০০টি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিপরীতে, রাশিয়ার নিজস্ব স্টিলথ ফাইটার সু-৫৭ কর্মসূচি নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা, ইঞ্জিনের সমস্যা এবং উৎপাদন জটিলতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে। রাশিয়ার বিমান বাহিনীতে বর্তমানে মাত্র ২৫ থেকে ৩০টির মতো সু-৫৭ সচল রয়েছে। এছাড়াও চীনের নতুন জে-৩৫ স্টিলথ ফাইটারটি ল্যান্ড-বেসড (স্থলভাগ) এবং ক্যারিয়ার-কেপাবল (যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য) উভয় সংস্করণেই সার্ভিসে প্রবেশ করছে, যা আমেরিকার পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টিলথ ইকোসিস্টেম তৈরি করতে যাচ্ছে।
শুধুমাত্র স্টিলথ বিমানই নয়, চীন তাদের মূল শক্তি বা ‘কমব্যাট মাস’ বাড়াতে বিপুল পরিমাণে সাড়ে চার প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। জে-১৬ একটি মাল্টিরোল স্ট্রাইক ফাইটার, যা বর্তমানে চীনের কাছে প্রায় ৪৫০টি রয়েছে। এর বিশেষ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সংস্করণ জে-১৬ডি শত্রুর রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম।
জে-১০সি আধুনিক এইসা রাডার এবং উন্নত অ্যাভিওনিক্স সমৃদ্ধ এই ফাইটারটি চীনের বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড। বর্তমানে এর সংখ্যা ৫৫০টি ছাড়িয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বিমান বাহিনী এক বড় ধরণের সংকটের মুখে পড়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক বিমান হারানো, সেমিকন্ডাক্টর ও আধুনিক ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশের অভাব এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে রাশিয়া তাদের বিমান বাহিনীকে নতুন করে আধুনিকায়ন করতে পারছে না। ফলে বিমান প্রযুক্তির দিক থেকে মস্কো এখন বেইজিংয়ের ওপর প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আকাশে দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকা এবং দূরপাল্লার আক্রমণে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চীন বেশ কিছু ‘ফোর্স-মাল্টিপ্লায়ার’ বা শক্তি বৃদ্ধিকারী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। কেজে-৫০০ অ্যাওয়াক্স আর্লি ওয়ার্নিং এয়ারক্রাফট আকাশপথের দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে এবং যুদ্ধবিমানগুলোকে নিখুঁত নির্দেশনা দিতে সাহায্য করে। মাঝআকাশে জ্বালানি সরবরাহের এই বিমানগুলো চীনের ফাইটার জেটগুলোর রেঞ্জ বা কার্যক্ষমতার পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে তারা এখন ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন ছাড়িয়ে আরও গভীরে অপারেশন চালাতে সক্ষম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও তাদের বিশ্বব্যাপী সামরিক ঘাঁটি, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং বিশাল এফ-৩৫ বহরের কারণে আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখলেও, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের এই দ্রুত উত্থান ওয়াশিংটনের জন্য স্নায়ুযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আকাশ প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

