বাংলাদেশের রাজশাহী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক তীর্থভ‚মি। বাংলাদেশের প্রথম যাদুঘর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম এই শহরেই ১৯১০ সালে স্থাপিত হয়। রাজশাহী শহরের শিরোইল এ ২০২৩ সালে স্থাপিত হয়েছে ফিল্ম এন্ড কালচারাল আর্কাইভ নামে এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে থাকা নানা ধরনের দূর্লভ সংগ্রহ মানুষকে অনায়াসে দাঁড় করায় অতীতের মুখোমুখি। ফিল্ম এন্ড কালচারাল আর্কাইভ এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসান কবীর লিটনের সাথে এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কথা বলেছেন ‘বাংলা কাগজ’ এর সম্পাদক মনিস রফিক।
বাংলা কাগজ: ‘ফিল্ম এন্ড কালচারাল আর্কাইভ’ এর যাত্রা ইতিহাস?
আহসান কবীর লিটন: দেখুন ইতিহাস রচিত হয় নতুন ইতিহাস গড়ার জন্য। তার মানে ইতিহাস, ঐতিহ্যের একটি গুরত্ব কিন্তু সমাজে রয়ে গেছে। ফেলে আসা সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ঐতিহ্য বা প্রযুক্তিগত বিবর্তন এসবতো আমাদের সভ্যতার অগ্রগামিতার মূলে রয়েছে। ফলে নিজের মধ্যে এসব সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাটা কেমন করে যেন বেশ ভাবিয়ে তুলতো। সেই ভাবনা থেকে এটি করা। আর যদি দায়বদ্ধতার কতা বলেন তবে বলবো সেটি তো সবারই রয়েছে। এই যেমন আমি যে পুকুরে গোসল করে পরিচ্ছন্ন থেকেছি, শরীরকে মজবুত করেছি। তারপর কতো যে মাঠে খেলেছি এবং শরীরকে দৃঢ় করেছি আবার মনোতৃপ্ততা পেয়েছি। সে পুকুর কিংবা মাঠগুলিতো আমার বাবার ছিল না, সেসব অন্য কারো ছিল। যে অক্সিজেন গ্রহণ করে আমরা বেঁচে থাকি, সেই কোটি কোটি গাছ তো লক্ষ লক্ষ মানুষ লাগিয়েছি। ফলে তাদের কাছেতো আমি ঋণি। এই ঋণের কিছু অংশতো শোধ করা দরকার। সমাজের কাছ থেকে যা নিয়েছি তার কিছু অংশ যদি পরিশোধ করতে না পারি, তাহলেতো অকৃতজ্ঞ রয়ে যাবো। তাই বড় টর কিছু না বলতে পারেন ঋণের বোঝা কিছুটা হালকা করার জন্য এসব করা। প্রতিটি মানুষেরই তেমনটি করা দরকার। কেউ হয়তো খেলার উন্নয়নে, কেউ পরিবেশের জন্য, কেউ বৃদ্ধাশ্রম বা এতিমখানা ইত্যাদিতে কন্ট্রিবিউট করা উচিৎ। যেহেতু আমি কালচারাল চর্চা করি। তাই ভাবলাম এই অঙ্গনে যদি কিছুটা কাজ করতে পারি। সে ভাবনা থেকেও বলতে পারেন এটি গড়ে তোলা।
বাংলা কাগজ: অন্য কোথাও না করে রাজশাহীতে তা গড়ে তুললেন কেন?
আহসান কবীর লিটন: আমি মনে করি, সবকিছু রাজধানী কেন্দ্রিক না করে প্রত্যেক বিভাগ বা জেলাতে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিৎ। তা রাজধানীর বাইরের চিত্রতো খুব সুখকর না। এটা নেই সেটা নেই, এই নেই নেই এর মধ্যে আমাদের বেড়ে উঠা। রাজশাহী তো তার ব্যতিক্রম না। ইতিহাস, ঐতিহ্য থাকলেও তা আবার হতাসা আর দীর্ঘশ^াসে যে ভরা। ভাবলাম এখানেই না হয় এক ফোটা জলদান যদি করা যায় এতে মৃতপ্রায় অশ^স্ত গাছটির যদি কিছু উপকার হয়।
বাংলা কাগজ: এই প্রতিষ্ঠানের শুরুতে কে কে ছিল?
আহসান কবীর লিটন: উদ্যোগ জিনিষটা এখানে একটু গোলমেলে বেঢ়প টাইপের আলাদা কিসিমের জিনিষ। যে এটি কাঁধে নিবে ব্যাস সিন্দাবাদের ভুতের মতো সেটি শেষঅব্দি ঘাড় থেকে আর নামবে না। তাকিয়ে দেখবেন আপনার আশে পাশে কেউ নেই। আপনি একা, বড় একা। আমার ক্ষেত্রেও সেটি ঘটেছে। বোঝাটাতো কাউকে না কাউকে টানতে হবে। সেটাই ছিলাম আমি। ফলে একা শুর করলেও পরে আমার ওয়াইফ আর দুই কন্যা সেটিতে যোগ দিয়েছে।

বাংলা কাগজ: আপনার প্রতিষ্ঠানের কি কি ধরণের জিনিষ আছে?
আহসান কবীর লিটন: এখানে চলচ্চিত্র, নাটক ও সঙ্গীতসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত দূর্লভ, দুষ্প্রাপ্য, মূল্যবান ও অমূল্য বিভিন্ন পণ্য ও উপকরণ সামগ্রী রয়েছে। সেসব এখানে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
বাংলা কাগজ: এখানে অনেক ধরণের গ্যালারি দেখলাম। এসব নিয়ে কি একটু বিশদভাবে বলবেন?
আহসান কবীর লিটন: এখানে ২টি ফ্লোরে ১২টি রুম রয়েছে। আর একটি ফ্লোর নির্মাণাধীন। এখানে মোট ২২টি গ্যালারি দেখতে পাবেন। গ্যালারিগুলো হলো- চলচ্চিত্র ঘর, রেডিও ঘর, গ্রামোফোন ঘর, প্রযুক্তি ঘর, সুর ঘর, সময় ঘর, কৃষি ঘর, ডাক ঘর, মুদ্রা ঘর, আর্ট ঘর, জলবায়ু ঘর, আলো ঘর, বই ঘর, গৃহস্থলি ঘর, আসবাব ঘর, বিজ্ঞান ঘর, রেকর্ড ঘর, মঞ্চনাটক ঘর, শিশু ঘর, ফটোগ্রাফি ঘর, পোস্টার ঘর এবং ভিন্নতা ঘর।
বাংলা কাগজ: গ্যালারির নামগুলি বেশ একটু অন্যরকম। তা এসব গ্যালারিগুলিতে কি কি রয়েছে?
আহসান কবীর লিটন: ‘চলচ্চিত্র ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে ১৬৫০ এর দশকে উদ্ভাবিত স্লাইড প্রোজেক্টর ‘ম্যাজিক ল্যান্টার্ন’ এটি জার্মান বিজ্ঞানী আথানাসিয়াস কির্শার আবিস্কার করেন বলে মনে করা হয়। ‘ম্যাজিক ল্যান্টার্ন’ ছিল কাচের স্লাইডে আঁকা ছবি আলোর সাহায্যে দেয়ালে প্রক্ষেপণের প্রথম প্রযুক্তি। প্রদর্শিত হয়েছে ২০শ শতকের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেস ক্যামেরা ‘গ্রাফলেক্স স্পিড গ্রাফিক’। এটি ১৯১২ সালে আমেরিকার রচেস্টার, নিউইয়োর্ক ‘গ্রাফলেক্স ক্যামেরা কোম্পানি’ তাদের গ্রাফিক সিরিজ চালু করে যা বড় ফরম্যাট প্রেস ক্যামেরার যুগ শুরু করে। রয়েছে ১৯২৯-১৯৩০ সালের দিকে আবিস্কৃত বিভিন্ন বক্স ক্যামেরা যেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য ফটোগ্রাফি সহজ করে দেয়। ১৯৩০ সালে আবিস্কৃত ‘সিনে কোডাক ৮ মডেল ২৫ হোম মুভি ক্যামেরা’ এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন সময়ের এইট এমএম ও সুপার এইট এমএম মুভি ক্যামেরা এবং প্রজেক্টর। রয়েছে বিভিন্ন প্রজম্মের ক্যামেরা, ইন্সট্যান্ট ফিল্ম ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সময় ও মডেলের ১৬ মিলিমিটার মুভি ক্যামেরা ও প্রজেক্টর।
‘রেডিও ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে বিংশ শতাব্দির মধ্যভাগের ও শেষদিকের বিভিন্ন প্রজম্মের রেডিও, ট্রানজিস্টর ও টেপ-রেকর্ডার। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৪০ এর দশকে আবিস্কৃত ও ব্যবহৃত বিভিন্ন মডেলের ভালব রেডিও এবং ১৯৫০ এর দশকে আবিস্কৃত ও ব্যবহৃত ট্রানজিস্টর রেডিও। রয়েছে ষাটের দশক এবং তার পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন মডেল ও প্রজম্মের রেডিও, টেপ-রেকর্ডার, রেকর্ড প্লেয়ার ও ওয়াকম্যান।
‘গ্রামোফোন ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের ১৮৭৭ সালে আবিস্কৃত ‘এডিসন স্ট্যান্ডার্ড ফনোগ্রাফ’। এছাড়াও রয়েছে আরো বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১৫টি গ্রামোফোন বা কলের গান। রয়েছে কয়েকটি সোলিড স্টেট পোর্টেবল রিল টু রিল টেপ-রেকর্ডার এটি ১৯৬৯ সালে বাজারজাত করা হয়।
রেকর্ড ঘরে প্রদর্শিত হয়েছে হয়েছে বিভিন্ন সময়ের প্রায় ১৮০০ ক্যাসেট, ৩০০ ভিডিও ক্যাসেট এবং প্রায় ২০০০ সিডি।
‘প্রযুক্তি ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন মডেলের টেলিফোন। এছাড়াও রয়েছে পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ আমলের বিভিন্ন মডেলের শতাধিক টেলিফোন। প্রদর্শিত হয়েছে ১৯৩৪ সালে আবিস্কৃত সিআরটি টেলিভিশন। এছাড়াও রয়েছে বক্স টিভি, বিভিন্ন মডেলের পুরাতন আমলের টিভি, সিডি প্লেয়ার, ভিসিডি প্লেয়ার, ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিসিআরসহ বিভিন্ন মডেলের টাইপ রাইটার।
‘গৃহস্থলি ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন আমলের গৃহস্থলির কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে পান রাখার পাত্র, আতরদানী, সুরমাদানী, গোলাপজলদানী, বিভিন্ন রকমের বাটি ও পাত্র, মেয়েদের সাজসজ্জায় ব্যবহৃত বিভিন্ন পাত্র যেমন- পাউডার রাখার পাত্র, গহনার বাক্স, হাড়ের তৈরী গহনার বাক্স, ছেলে-মেয়েদের সাজসজ্জায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ, বিভিন্ন রকমের প্রদীপ, অ্যাসট্রেসহ বিভিন্ন মডেল ও উপকরণে তৈরী ফুলদানী। রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি কালো পাথরের থালা যেটি এই উপমহাদেশের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে।
বাংলা কাগজ: সময়ঘর নিয়ে কিছু বলেন?
আহসান কবীর লিটন: সময়কে না ধরলেতো সামনে এগোনো যায় না। এখানে সময়কে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। দেখতে পাবেন বিভিন্ন মডেল ও সময়ের পেন্ডুলাম দেয়াল ঘড়ি, টেবিল ঘড়ি ও হাতঘড়ি। যখন ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ আবিস্কার হয় নি এই ঘড়িগুলো তখনো নির্ভুল সময় দিয়েছে।
বাংলা কাগজ: অন্যান্য গ্যালারি নিয়ে কিছু বলেন?
আহসান কবীর লিটন: ‘কৃষি ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে নানা রকমের কৃষি যন্ত্রপাতি। কৃষি এবং কৃষকের সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই ঘরে। রয়েছে বিভিন্ন রকমের নিড়ানি, কাস্তে, দা, বটি, বিভিন্ন রকমের হাসুয়া, কোদাল, বাশেঁর তৈরী বিভিন্ন রকমের আসবাবপত্রসহ নানাকিছু। এছাড়াও রয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন জাতের ধান বীজ। এখানে একটি বীজ লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত করা হবে।
‘আলো ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে প্রাচীন আমলের আলোকায়নে ব্যবহৃত নানা উপকরণ। রয়েছে আলোর বিবর্তনের বিভিন্ন রকমের কুপি বাতি, হ্যারিকেন ও লন্ঠন, টর্চ লাইট, হ্যাচাক বাতি, রেল ল্যাম্পসহ নানা রকমের সরঞ্জাম।
‘সুর ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্র যেমন- সেতার, সরোদ, সারিন্দা, এ¯্রাজ, নাগারা, খোল, পাখোয়াজ। রয়েছে বিভিন্ন রকমের বাঁশি যেমন- বিউগল, কর্ণেটসহ প্রায় ৭ রকমের বাশের বাঁশি, তাল, করতাল, খঞ্জনি, ডুগি, স্কুলের ঘন্টা, হাত বায়া, তানপুরা, ইন্ডিয়ান ব্যাঞ্জো বা বুলবুল তরঙ্গ, ঢোল, ঢোলক, একতারা, দোতারা, খমক, বীণ, শঙ্খ বা শাখ। রয়েছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্র যেমন- ধুধুক। এখানে স্থান পেয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো একটি গ্রান্ড পিয়ানো। পিয়ানোটি এখনো সচল অবস্থায় রয়েছে এবং এটি প্রায় ২২০ কেজি ওজন।
‘মুদ্রা ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে বিশে^র প্রায় ৬০ টি দেশের প্রাচীন আমলের ধাতব মুদ্রা এবং কাগজের নোট। ডাক ঘর গ্যালারীতে প্রদর্শিত হয়েছে বিশে^র প্রায় ১৩০ টি দেশের পঞ্চাশোর্ধ বা শতবছরের পুরনো ডাকটিকিট ও রাজস্ব স্ট্যাম্প। এই গ্যালারী থেকে যে কেউ বিশে^র বিভিন্ন দেশ, তাদের কলোনী এবং তাদের ডাকটিকিট সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে।
‘আর্ট ঘরে’ প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন চিত্রকর, পটুয়া ও ভাস্করের তৈরীকৃত আর্ট বা চিত্র এবং ভাস্কর্য। এখানে ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত শিল্পকলা ‘পটচিত্র’ প্রদর্শণ করা হয়েছে। বাংলার পটচিত্র পট বা বস্ত্রের উপর আঁকা একপ্রকার লোকশিল্প। এটি প্রাচীন বাংলার অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এছাড়াও প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ের শিল্পকর্ম, নকশি কাঁথা, ফাইবার ও পাথরের তৈরী ভাস্কর্য।
বাংলা কাগজ: লাইব্রেরি নিয়ে আলোচনা না করলেতো ঠিক পূর্ণতা পায় না। এখানে একটি লাইব্রেরি রয়েছে সেটা নিয়ে কিছু বলেন?
আহসান কবীর লিটন: চলচ্চিত্র, নাটক, সঙ্গীত, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলা ও ইংরেজী ভাষার গল্প, উপন্যাস, কবিতাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধরণের প্রায় ৫ হাজারের অধিক মূল্যবান বইয়ের সমৃদ্ধ বই ঘর। তাছাড়া রয়েছে বিভিন্ন সময়ের পেপার-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও জার্নাল। এই লাইব্রেরির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে অন্যান্য বইয়ের পাশে চলচ্চিত্র এবং নাটকের বই, জার্নাল ইত্যাদিকে প্রাধাধ্য দেওয়া যাতে একজন এখানে এসে এই দুটি বিষয়ে গবেষনা করার রসদ পেতে পারে।
বাংলা কাগজ: এখানে একটি বায়োস্কোপ দেখলাম এটা নিয়ে যদি কথা বলতেন?
আহসান কবীর লিঠন: এটির আকর্ষণ বলার মতোন। যারা এখানে আসেন তারা বড় হোক আর ছোট হোক এই বায়োস্কোপ তাদেরকে খুব টানে। বড়রা শৈশবে হারায় আর ছোটরা অবাক হয়ে দেখে। বলতে পারেন এটি একসময় এই জনপদের একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম ছিল।
বাংলা কাগজ: এই জিনিসগুলো সংগ্রহের ইতিহাস?
আহসান কবীর লিটন: এটি অবশ্যই একটি কঠিন কাজ ছিল। এবং তা দুবছরের মধ্যে জোড়ার করা দু:স্কর কাজ ছিল। এটি এমনতো না যে টাকা নিয়ে দোকানে গেলাম আর কিনে নিলাম। এখানে তো একটিও এন্টিকের দোকান নেই আর ঢাকাতে যা কিছু আছে সেখানে পা দিলেতো আমাদের মতোন মানুষের পা পুড়ে যাওয়ার কথা। তবে এই কঠিন কাজটি অনেকটা সহজ করেছিল ইন্টারনেট। তার মাধ্যমে অনেক তথ্য পেয়েছি। তারপর বিশে^র বিভিন্ন দেশ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ক্যামেরা এবং গ্রামোফোন গ্যালারীর ৯৫ ভাগই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং পাশ^বর্তী দেশ ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। গেøাবাল অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইটসি, ইবে থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া কখনো বিদেশ গেলে খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসি। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহর, বিভাগীয় শহরের হাট-বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। আর অল্প কিছু জিনিষ কিছু জন ডোনেট করেছে।
বাংলা কাগজ: এই প্রতিষ্ঠান যে জায়গায় গড়ে ওঠেছে তা কি ভাড়ায় চালিত নাকি পারবারিক জায়গা?
আহসান কবীর লিটন: বর্তমানে ‘ফিল্ম এন্ড কালচারাল আর্কাইভ’ টি যে জায়গায় পরিচালিত হচ্ছে এটি আমাদের পৈত্রিক বাড়ি। পৈত্রিক সম্পত্তি যেহেতু এখনো বন্টন হয় নি। তাই এখন মাসিক ভাড়া দিতে হয় তবে পৈত্রিক সম্পত্তির ছিটা ফোটা যা ভাগে পাবো সেখানে ‘ফিল্ম এন্ড কালচারাল আর্কাইভ’ এর নিজস্ব ভবন করা যাবে। অথবা এই বাসাতেই রেখে দেওয়া যায় কিনা সেটি নিয়েও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কথাবার্তা চলছে।
বাংলা কাগজ: এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কি কি ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
আহসান কবীর লিটন: এই সংগ্রহশালা টিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থ বা টাকা। ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, স্টাফ এর বেতন সবমিলিয়ে প্রতিমাসে অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়। এখন পর্যন্ত কোন অনুদান পাই নি। যতোদিন না পাই এভাবেই একটু কষ্ট করেই চালাতে হবে।
বাংলা কাগজ: আপনার সংগ্রহে যে জিনিষগুলি আছে তার মধ্যে আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য রয়েছে?
আহসান কবীর লিটন: আমাদের সংগ্রহের জিনিসগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর বেশিরভাগই সচল অবস্থায় রয়েছে। এখানে সেই ১৬৫০ এর দশকের ম্যাজিক ল্যান্টার্ণ ও পেন্ডুলাম ঘড়ি; ১৮৭০ এর দশকে আবিস্কৃত এডিসন স্ট্যান্ডার্ড ফনোগ্রাফ; ১৮৯০ এর দশকের বায়োস্কোপ; প্রায় দুইশত বছরের পুরোনো কালো পাথরের থালা ও খাট বা পালঙ্ক; দেড়শত বছরের পুরোনো পিয়ানো, বাদ্যযন্ত্র; শতবছরের পুরোনো ক্যামেরা, প্রজেক্টর, চেয়ার ও টেবিল; ১৯৩০ এর দশকের সিআরটি টেলিভিশন, ১৯৪০ এর দশক ও তার পরবর্তী সময়ের ভালব রেডিওসহ রয়েছে নানাবিধ সংগ্রহ।

বাংলা কাগজ: দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নাকি কোন ফি আছে?
আহসান কবীর লিটন: এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। আমি চাই বেশি বেশি মানুষ এসব দেখুক। দরকার হলে চা বিস্কিট খাওয়াইয়ে দেখাবো। তবু তারা বেশি বেশি আসুক এবং দেখুক। বড়রা ইতিহাসকে একটু স্মরণ করুক। আর তরুণ ও ছোটরা অতীতকে বোঝার ও জানার চেষ্টা করুক।
বাংলা কাগজ: এখানে কোন ধরণের দর্শনার্থী আসে?
আহসান কবীর লিটন: এখানে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণীর দর্শনার্থীরা আসেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষেরা নিয়মিত আসেন। বেশিরভাগই তাদের পরিবার এবং বাচ্চাদের নিয়ে আসেন।
বাংলা কাগজ: এই প্রতিষ্ঠান কি বাইরে কোন প্রদর্শনীর আয়োজন করে? যদি করে তাহলে সেখানে কেমন সাড়া পড়ে?
আহসান কবীর লিটন: আর্কাইভ এর নিয়মিত প্রদর্শনীর পাশাপাশি বাহিরেও এর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়ে থাকে। ইতোপূর্বে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় এবং প্রতিবছর রাজশাহী বইমেলায় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীগুলোতে মানুষের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। বিশেষকরে বায়োস্কোপ এর প্রতি মানুষের একটি বিশেষ আগ্রহ থাকে এবং মুরুব্বিরা তাদের শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন এবং তাদের সন্তানদের সাথে নিয়ে আগ্রহ সহকারে বায়োস্কোপসহ প্রদর্শনী উপভোগ করেন।
বাংলা কাগজ: এখানে কোন স্টাফ আছে কিনা?
আহসান কবীর লিটন: ‘ফিল্ম এন্ড কালচারাল আর্কাইভ’ এর পরিচালনা এবং দেখাশোনার জন্য আপাতত দুই জন স্টাফ রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ৫ জন স্টাফের প্রয়োজন।
বাংলা কাগজ: প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় কোথা থেকে আসে?
আহসান কবীর লিটন: এটির পরিচালন ব্যয় এখন পর্যন্ত আমি বহন করছি।
বাংলা কাগজ: আপনার প্রতিষ্ঠানে কোন অনুদান এসেছে কিনা?
আহসান কবীর লিটন: না, এখন পর্যন্ত কোন অনুদান আসে নি তবে আমরা আশাবাদি নিশ্চয়ই অনুদান আসবে।
বাংলা কাগজ: এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আপনার কোন ম্যাসেজ দেওয়ার আছে কি?
আহসান কবীর লিটন: আমাদের বলা এবং চাওয়াটা খুব ছোট কিন্তু অর্থ অনেক ব্যাপক। আমাদের সভ্যতাতো অনেক প্রতিবন্ধকার মধ্যে দিয়ে আজকে এখানে এসে পৌছেছে। তাহলে কেন আমরা আমাদের ভবিষৎকে ধ্বংস করতে চাচ্ছি। আসুন যুদ্ধ-বিগ্রহকে না বলি, পরিবেশ যেন ধ্বংস না করি আর মানবিকতাকে আরো বিকশিত করি।
বাংলা কাগজ: এমন এক কাজে যাদের আগ্রহ আছে সেরকম মানুষ যারা দেশ বিদেশে থাকে, তারা যদি চায়, তাহলে তারা কিভাবে যুক্ত অথবা সহযোগিতা করতে পারে?
আহসান কবীর লিটন: কেউ যদি এই কাজের সাথে যুক্ত হতে চাই বা সহযোগিতা করতে চাই, আমরা খুশি মনে তা গ্রহণ করবো। ইচ্ছে করলেই দেশি বিদেশিরা এখানে আজীবন সদস্য, দাতা সদস্য, বন্ধু সদস্য হতে পারবে। আমাদের ওয়েবসাইটে, ফেইসবুক পেইজে বা সরাসরি যোগাযোগ করে আমাদের সাথে যুক্ত হওয়া যাবে। এছাড়া ডোনেশন, স্পন্সরশিপ এর মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন। বিদেশ থেকে বিভিন্ন দূর্লভ বই, পোস্টার, ম্যাগাজিন, ভিনাইল রেকর্ড, ফিল্ম রিল, ক্যামেরা, প্রজেক্টর ইত্যাদি সংগ্রহ করে উপহার হিসেবে পাঠাতে পারেন। তাছাড়া যারা বিদেশে আছেন তারা সে দেশের বিশ^বিদ্যালয়, মিউজিয়াম, কালচারাল ইন্সটিটিউট, ফিল্ম আর্কাইভ বা এম্বাসির সাথে পার্টনারশিপ তৈরী করে দিতে পারেন।
বাংলা কাগজ: আগামী দিনের স্বপ্ন?
আহসান কবীর লিটন: আমার ইচ্ছে আছে অনেকটা বিশ^ সাহিত্য কেন্দ্রের আদলে এক বা একাধিক গাড়িতে ভ্রাম্যমান যাদুঘর গড়ে তোলা। তারপর ইতিহাস আর ঐতিহ্য ভরা ভ্রাম্যমান যাদুঘর নিয়ে রওয়ানা দিবো দেশ বিদেশে। সাথে থাকবে শান্তি, পরিবেশ ও মানবিকতার মন্ত্র ।
বাংলা কাগজ: অনেক ধন্যবাদ।
আহসান কবীর লিটন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

