রাশিদুল হাসান : কুইবেক সরকার জনসমক্ষে প্রার্থনা বা নামাজ নিষিদ্ধ করতে একটি বিল উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। গত ২৮শে আগস্ট, বৃহস্পতিবার প্রাদেশিক ধর্মনিরপেক্ষতা মন্ত্রী জঁ-ফ্রাঁসোয়া রোবের্জ এক বিবৃতিতে জানান, “রাস্তার প্রার্থনার প্রসার একটি গুরুতর ও সংবেদনশীল বিষয়।
কুইবেকের প্রিমিয়ার আমাকে ধর্মনিরপেক্ষতা শক্তিশালী করার দায়িত্ব দিয়েছেন এবং আমি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে বদ্ধপরিকর।”
তিনি আরও বলেন, “এই শরতে আমরা একটি বিল আনব, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আরও জোরদার করা হবে, বিশেষ করে জনসমক্ষে নামাজ বা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে।”
রোবের্জের এ ঘোষণা কুইবেকের সরকার–নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন আভেনির কুইবেক (ঈঅছ)–এর মাসব্যাপী প্রচেষ্টার অংশ। এর আগে সরকার একটি আইন পাশ করেছে, যেখানে অভিবাসীদের প্রদেশের সাধারণ সংস্কৃতিকে গ্রহণ করার শর্ত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল সহায়ক কর্মীদের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিল টেবিলে আনা হয়েছে।
তবে বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতে সরকার কীভাবে জনসমক্ষে নামাজ নিষিদ্ধ করবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো অবশ্য এর আগে বলেছিলেন, প্রয়োজনে “নটউইথস্ট্যান্ডিং ক্লজ” ব্যবহার করা হতে পারে। তিনি গত ডিসেম্বরে বলেন, “রাস্তা বা পার্কে মানুষকে প্রার্থনা করতে দেখা আমরা কুইবেকে চাই না। আমরা খুব স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই ইসলামপন্থীদের প্রতি। প্রার্থনা করতে চাইলে গির্জা বা মসজিদে যেতে হবে, জনসমক্ষে নয়।
সা¤প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে লেগোর ঈঅছ সরকার। টানা তিনটি উপনির্বাচনে তারা হেরে গেছে স্বাধীনতাপন্থী পার্টি কুইবেকোয়া (চছ)–এর কাছে। একইসঙ্গে লেগো আগামী সপ্তাহে হাজির হবেন একটি জন তদন্তে, যেখানে ঝঅঅছপষরপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম–এর দুর্নীতি ও অর্ধ–বিলিয়ন ডলারের বাজেট অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
গত গ্রীষ্মে মন্ট্রিয়লে মুসলিমদের জনসমক্ষে নামাজ পড়ার ছবি সংবাদ শিরোনাম হয়। এর পাশাপাশি, গত মাসে নটর-ডেম বাসিলিকা অব মন্ট্রিয়াল–এর বাইরে মুসলিমদের নামাজ আদায়ের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যা সামাজিক মাধ্যমে ১৪ হাজারবার শেয়ার করা হয়।
যদিও শুধু মুসলিম নয়, খ্রিস্টান স¤প্রদায়েরও জনসমক্ষে ধর্মীয় কার্যক্রম রয়েছে। প্রতি বছর গুড ফ্রাইডেতে মন্ট্রিয়ালে ক্যাথলিক আর্চবিশপ–এর নেতৃত্বে ওয়েই অব দ্য ক্রস শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া :
কানাডিয়ান মুসলিম ফোরাম (ঈগঋ) এক বিবৃতিতে বলেছে, জনসমক্ষে নামাজ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রকাশ। এটিকে নিষিদ্ধ করলে তা স¤প্রদায়গুলোর প্রতি কলঙ্কজনক হবে এবং সামাজিক সংহতি নষ্ট করবে।
তারা আরও উল্লেখ করেছে, “কুইবেকবাসী যখন স্বাস্থ্যসেবার সংকট, ঝঅঅছপষরপ কেলেঙ্কারি, আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে ভুগছে, তখন সরকারের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত প্রকৃত সমস্যার সমাধান, নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিয়ন্ত্রণ নয়।”
অন্যদিকে, চছ নেতা পল সাঁ-পিয়ের প্লামন্দঁ বলেছেন, তিনি জনসমক্ষে নামাজ নিষিদ্ধ করার আইনের বিপক্ষে নন, তবে প্রশ্ন তুলেছেন কেন এত দেরিতে সরকার এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। “প্রিমিয়ার বলছেন তিনি গত এক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। তাহলে এতদিন কিছুই করলেন না কেন?”
কানাডিয়ান সিভিল লিবার্টিজ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, এ ধরনের আইন ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সমিতি গঠনের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করবে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, “জনসমাগমস্থল সবার—ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষে। এগুলো এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে বৈচিত্র্যকে সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়া হয়।”
উপদেষ্টা কমিটির প্রতিবেদন :
কয়েক দিন আগে এক উপদেষ্টা কমিটি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল, কুইবেকের বিল ২১–এর আওতায় ধর্মীয় প্রতীকের নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে শিশু দিবাযতœ কেন্দ্রের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হোক। তবে তারা জনসমক্ষে প্রার্থনা নিষিদ্ধের পরামর্শ দেয়নি। কমিটি মনে করেছে, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা স্থানীয় পৌরসভাগুলোর হাতে ইতিমধ্যেই রয়েছে।
প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “আমাদের অবস্থান হচ্ছে সংযম—যেখানে একদিকে কুইবেকের সামষ্টিক মূল্যবোধবিরোধী অপব্যবহার ঠেকাতে হবে, অন্যদিকে ব্যক্তির ধর্মীয় অনুশীলনও সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে জনশৃঙ্খলা ও জনসমাগমস্থলের মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।”
তবুও মন্ত্রী রোবের্জ বলেছেন, কমিটির প্রতিবেদনই সরকারকে নতুন বিল আনার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে। “ককাসে আলোচনার পাশাপাশি এই প্রতিবেদনের কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা অনেক দূর এগিয়েছে,” তিনি বলেন। সূত্র : সিবিসি নিউজ

