অনলাইন ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরার স্পষ্ট সংকেত দিয়েছেন দখলদার রাষ্ট্রটির প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা। বর্তমান সরকারকে অভিযুক্ত করে তিনি সতর্ক করেছেন যে, তারা দেশকে একটি “নিরাপত্তা বিপর্যয়ের” দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যুদ্ধের ২৭তম দিনে এক টেলিভিশন বিবৃতিতে মধ্য-ডানপন্থী দল ‘ইয়েশ আতিদ’-এর প্রধান ইয়ার লাপিদ বলেন, “আমি ইসরায়েলের নাগরিকদের সতর্ক করতে চাই। আমরা আরেকটি নিরাপত্তা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছি।”
লাপিদ আরও যোগ করেন, “ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করছে। সরকার সেনাবাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে জখম অবস্থায় ফেলে রাখছে।”
বিরোধী এই নেতা অভিযোগ করেন যে, সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়াই সেনাবাহিনীকে বহুমুখী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার মতে, বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে সেনাসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
লাপিদ দীর্ঘদিন ধরে সরকারের যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা করলেও গাজা, ইরান ও লেবাননে সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার তার এই নাটকীয় মন্তব্য আসে গত বুধবার সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামিরের ফাঁস হওয়া এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় জেনারেল জামির বলেছিলেন, “আইডিএফ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। আমি ১০টি লাল পতাকা (সতর্ক সংকেত) দেখাচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, “রিজার্ভ সেনারা আর টিকে থাকতে পারবে না” এবং সেনাবাহিনীর জন্য এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘বাধ্যতামূলক নিয়োগ আইন’ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে অতি-কট্টরপন্থী (আল্ট্রা-অর্থোডক্স) ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের কথা বলা হয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছে।
ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিকই এই অব্যাহতির বিরোধী এবং তারা সবার জন্য সমান সামরিক আইনের পক্ষে। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার জোট সরকারের টিকে থাকার জন্য এই অতি-কট্টরপন্থী দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে তিনি বিভিন্ন কৌশলে এই আইন পাসের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘কান’-এর তথ্যমতে, নেতানিয়াহু নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে সেনাবাহিনী সব ধরনের সহায়তা পাবে। আগামী ১ থেকে ৯ এপ্রিল পাসওভার ছুটির পর এই নিয়োগ আইন পাস হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় করা এক নিয়মের অধীনে এই গোষ্ঠীটি ধর্মীয় শিক্ষার দোহাই দিয়ে সামরিক সেবা থেকে ছাড় পেয়ে আসছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সরকার কোথাও জিতছে না—লেবাননেও নয়, গাজাতেও নয়। ইরানের ক্ষেত্রে কী হয় তা দেখা যাবে। ইরানে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, কিন্তু সেখানে এখনো ৪৬০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়ে গেছে।”
বামপন্থী ‘ডেমোক্র্যাটস’ জোটের নেতা এবং সাবেক ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ইয়ার গোলান ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটও অবিলম্বে সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সামরিক বাহিনীও স্বীকার করেছে যে তারা বর্তমানে সৈন্য সংকটে ভুগছে। সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফি ডেফরিন এক সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে, আইডিএফ-এর আরও ‘কমব্যাট ট্রুপস’ বা যোদ্ধা প্রয়োজন, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য।

